প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বর্তমান ব্যস্ত জীবনের ধারা মানুষকে রাত জাগার অভ্যাসের দিকে ধাবিত করছে। পড়াশোনা, অফিসের কাজ, মোবাইল স্ক্রিনে সময় কাটানো বা টেলিভিশন দেখা—সবই রাতের নিদ্রাহীন সময়কে স্বাভাবিকতর করে তুলেছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এই অভ্যাস খুবই প্রচলিত। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা নির্দেশ করছে যে, দীর্ঘমেয়াদে রাত জাগা অভ্যাস আমাদের হৃদ্যন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং হার্ট অ্যাটাকসহ অন্যান্য হৃদ্রোগজনিত সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
গবেষকরা তিন লাখেরও বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, যেসব ব্যক্তি প্রাকৃতিকভাবে দেরিতে ঘুমাতে যান ও দেরিতে ওঠেন, তাদের মধ্যে হৃদ্রোগ, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে ১৫–১৬ শতাংশ বেশি। গবেষকরা ব্যাখ্যা করেছেন, এর মূল কারণ হলো দেহঘড়ির ব্যাঘাত। মানবদেহ স্বাভাবিকভাবে দিনের আলো ও অন্ধকারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করে। রাতে দেরিতে জাগা এবং দেরিতে ঘুমালে শরীরের এই স্বাভাবিক ছন্দ বিঘ্নিত হয়। ফলে হরমোন নিঃসরণ, রক্তচাপ, রক্তে শর্করার মাত্রা ও হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
তাছাড়া রাত জাগা মানুষের জীবনযাপন পদ্ধতিও প্রভাবিত করে হৃদ্রোগের ঝুঁকি। তারা প্রায়ই অনিয়মিত খাবার খান, শারীরিক ব্যায়াম কম করেন, ধূমপান বা অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণের প্রবণতা বেশি থাকে। এসব অভ্যাস মিলিতভাবে দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, শুধু রাত জাগাই প্রধান কারণ নয়; বরং সঙ্গে যুক্ত জীবনধারার অভ্যাসগুলোই মূল ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ কেউ রাত জাগলেও যদি স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ করে, নিয়মিত ব্যায়াম করে এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করে, তবে ঝুঁকি অনেকাংশেই কমানো সম্ভব।
হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞরা সুস্থ জীবনধারার ওপর জোর দিয়েছেন। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী, প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। ঘুমের মান উন্নত করতে ঘুমানোর আগে স্ক্রিন কম ব্যবহার করা, হালকা পরিবেশে ঘুমানো, এবং মানসিক চাপ কমানো গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি দিনে পর্যাপ্ত শারীরিক কার্যক্রম, সুষম খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান এড়িয়ে চলা এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ হৃদ্রোগ প্রতিরোধে সহায়ক।
গবেষকরা আরও উল্লেখ করেছেন, দেরিতে ঘুমানোর ফলে শরীরের বিভিন্ন হরমোনের উৎপাদন পরিবর্তিত হয়। বিশেষ করে কার্টিসল ও মেলাটোনিনের নিঃসরণের সময়সূচি ব্যাহত হয়, যা রক্তচাপ ও হৃদ্যন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলে। নিয়মিত রাত জাগা ও অনিয়মিত ঘুমের কারণে এই প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী ক্ষতির দিকে নিয়ে যেতে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে হৃদ্রোগের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। রাত জাগা মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও চাপের মাত্রা বেশি থাকতে পারে। মানসিক চাপ বৃদ্ধির কারণে শরীরে প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, যা হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই স্বাস্থ্যকর জীবনধারা ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে অপরিহার্য।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, রাত জাগা অভ্যাস সবসময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে না হলে এটি কম ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। অর্থাৎ রাত জাগলেও স্বাস্থ্যকর অভ্যাস বজায় রাখা সম্ভব। নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত পানি পান, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত ঘুম—এসব অভ্যাস হৃদ্রোগ প্রতিরোধে সহায়ক।
সব মিলিয়ে বলা যায়, রাত জাগা অভ্যাস শুধু ক্লান্তি ও মানসিক চাপের কারণ নয়, বরং এটি নীরবে আমাদের হৃদ্যন্ত্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। সুস্থ হৃদ্যন্ত্র ও দীর্ঘায়ু নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সময়মতো ঘুমানো, স্বাস্থ্যকর জীবনধারা গ্রহণ এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, রাত জাগা অভ্যাসকে অবহেলা করা বিপজ্জনক হতে পারে।
এই গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্ক সকলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। ব্যস্ত জীবনে রাত জাগা অনিবার্য হলেও জীবনধারার অন্যান্য স্বাস্থ্যকর অভ্যাসগুলো বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুস্থ হৃদ্রোগহীন জীবনযাপনের জন্য সময়মতো ঘুমানো, সুষম খাদ্যগ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেওয়া অপরিহার্য।