অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ভারত, চীন ও রাশিয়া ঋণ দেয়নি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫ বার
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ভারত, চীন ও রাশিয়া ঋণ দেয়নি

প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের আমলে ভারতের, চীনের ও রাশিয়ার কোনো নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি মেলেনি। তবে এই সময়ের মধ্যে পূর্বে দেওয়া ঋণের অর্থদান কার্যক্রম চালু থাকে। তিন দেশের এই চলমান অর্থ ছাড়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ মোট দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ পায়, কিন্তু নতুন কোনো প্রকল্পে আর্থিক প্রতিশ্রুতি পাননি।

দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে বিদেশি ঋণ সাধারণত দুই দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে। অন্তর্বর্তী সরকারের এই সময়কালে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কিছুটা টানাপোড়েনপূর্ণ ছিল। বিশেষত রাজনীতিক কারণে ভারত বাংলাদেশে পরিচালিত বিভিন্ন প্রকল্পে নতুন ঋণদানে আগ্রহী ছিল না। রাশিয়ার সঙ্গে রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প নিয়েও প্রথম দিকে আলোচনা ও সমালোচনা দেখা দেয়। চীনের পক্ষ থেকেও কোনো নতুন প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগ দেখা যায়নি। এই কারণে তিন দেশই নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি দেয়নি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ–অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও ঋণ বিষয়ক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই সময়কালে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে নতুন ঋণের উদ্যোগ সীমিত ছিল।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়া নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান প্রথম আলোকে জানান, ‘ভারতের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক শুরু থেকেই কিছুটা শীতল ছিল। ফলে নতুন ঋণ বা বড় প্রকল্প নেওয়া সহজ হয়নি। এছাড়া চীন, রাশিয়া এবং ভারতের সঙ্গে নতুন বড় প্রকল্পের বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার আগ্রহী ছিল না। কারণ পূর্ববর্তী সরকারের ঋণ গ্রহণ ও প্রকল্প নিয়ে সমালোচনা চলমান ছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘নতুন রাজনৈতিক সরকারের সময়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনঃপর্যালোচনা করা হবে। নতুন সরকারের অধীনে বিদেশি ঋণ ও প্রকল্পের গতি বাড়তে পারে।’

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের এই দুই বছরের সময়ে বিদেশি অর্থায়নে নতুন বড় কোনো প্রকল্প গ্রহণ হয়নি। ভারতের সঙ্গে কোনো নতুন লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি) নিয়ে আলোচনা হয়নি। চীনের পক্ষেও একই পরিস্থিতি ছিল। বিশেষত চীনের অর্থায়নে প্রকল্পের মান ও খরচ নিয়ে সমালোচনা থাকায় নতুন উদ্যোগে সীমাবদ্ধতা দেখা দেয়। রাশিয়ার সঙ্গে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প চলমান থাকলেও নতুন কোনো প্রকল্প নেওয়া হয়নি।

কতটা ঋণ দেওয়া হয়েছে, তারও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে ভারত, চীন ও রাশিয়া সব মিলিয়ে ২১৭ কোটি ডলার অর্থ ছাড় করেছে। ভারত এক্সিম ব্যাংকের মাধ্যমে এলওসির আওতায় গত দেড় বছরে ২৯ কোটি ডলার অর্থ ছাড় করেছে। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারত ১৭৮ কোটি ডলার ছাড় করেছিল। মোট ৩টি এলওসির আওতায় সড়ক ও রেল যোগাযোগ, জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে ৩৬টি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে ১৫টি সম্পন্ন হয়েছে।

চীনের এক্সিম ব্যাংক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালেই চলমান প্রকল্পের জন্য ৬৩ কোটি ডলার অর্থ ছাড় করেছে। অন্যদিকে রাশিয়ার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের খরচ ১৩ বিলিয়ন ডলার। এর আওতায় রাশিয়া ১২৫ কোটি ডলার ছাড় করেছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভারত, চীন ও রাশিয়া নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি না দিলেও বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও জাপানসহ বড় দাতা দেশ ও সংস্থার প্রতিশ্রুতি অব্যাহত ছিল। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই–ডিসেম্বর) এসব সংস্থা ১৯৯ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাজনৈতিক সরকারের সময়ে দ্বিপক্ষীয় ঋণ ও প্রকল্প গ্রহণ বেশি থাকে। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক সরাসরি ঋণ ও প্রকল্পে প্রভাব ফেলে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এই সম্পর্কের সংবেদনশীলতা ও আগের সরকারের প্রকল্প নিয়ে সমালোচনার কারণে নতুন ঋণ গ্রহণে শিথিলতা দেখা দেয়। নতুন নির্বাচিত সরকারের অধীনে এই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনঃপর্যালোচনা করা হবে এবং ঋণপ্রাপ্তির হার বাড়তে পারে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিদেশি ঋণ বা প্রকল্পের শিথিলতা বাংলাদেশে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে সাময়িক প্রভাব ফেলেছে। তবে চলমান প্রকল্পের অর্থ ছাড় ও বড় দাতা সংস্থার প্রতিশ্রুতি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে ভারত, চীন ও রাশিয়ার ঋণসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নতুন ঋণ না আসলেও চলমান প্রকল্পের অর্থায়ন দেশের অবকাঠামো ও শিল্প খাতে অব্যাহত থাকে। নতুন নির্বাচিত সরকারের অধীনে এই ঋণ ও প্রকল্পের গতি বৃদ্ধি পেতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত