প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরাজিত বা চ্যালেঞ্জিং প্রার্থীরা নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের সভাকক্ষে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করে ৩২ আসনে ভোট পুনঃগণনার দাবি জানিয়েছেন। এই দাবির মাধ্যমে তারা ভোট প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং নির্বাচনের জটিলতার প্রমাণ চেয়েছেন।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জামায়াতে ইসলামের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ডা. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ অভিযোগ করেন, নির্বাচনের সময় বিভিন্ন অনিয়ম ও অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেছে। তিনি বলেন, অবৈধ অস্ত্র, কালো টাকা, হুমকি-ধমকি এবং জাল ভোটের মতো উপাদান সক্রিয় ছিল। তিনি আরও জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে এখনও ৪০০ পিস্তল উদ্ধার হয়নি, যা নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে। এ ধরনের অনিয়ম নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার মতো বলে ডা. হামিদুর রহমান আযাদ উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে—আমরা লক্ষ্য করেছি। কিছু কেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সিল মারার অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি বারবার কমিশনকে জানানো হলেও কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট তড়িঘড়ি প্রকাশ করা হয়েছে। এই দ্রুত প্রকাশের কারণে অনেক প্রার্থী যথাসময়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানাতে পারেননি।
ভোটের হার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এই নেতা। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন শেষ হয়েছে বিকেল সাড়ে ৪টায়। কিন্তু কিছু কেন্দ্রে ভোট শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে অস্বাভাবিক ভোটের হার দেখা গেছে। আবার ভোট শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই কেন্দ্রগুলোতে অস্বাভাবিক হারে ভোট পড়ার তথ্য পাওয়া গেছে।’
ফলাফল শিটে ঘষামাজার অভিযোগও তোলেন হামিদুর রহমান। তিনি জানান, ঢাকা-৬ আসনে তাদের প্রার্থীর একজন এজেন্ট মুসলিম হলেও ফলাফল শিটে একজন হিন্দুর স্বাক্ষর রয়েছে। এছাড়া কিছু স্থানে পেনসিল দিয়ে ফলাফল লেখা হয়েছে, যা প্রমাণ করে সূক্ষ্মভাবে কারচুপি করা হয়েছে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে ১১ দলীয় জোট পুনঃগণনা এবং অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ডা. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আজাদ, জোটের লিয়াজোঁ কমিটির মিডিয়া সমন্বয়ক ও জামায়াত নেতা এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, জামায়াত নেতা ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান এবং এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা। এছাড়া চারজন নির্বাচন কমিশনার এবং ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদসহ কমিশনের অন্যান্য কর্মকর্তাও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে শনিবার রাতে ১১ দলীয় ঐক্য সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছিল, তারা নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। বৈঠককে কেন্দ্র করে জোটের নেতারা নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও ফলাফলের সঠিকতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।
রাজনীতিবিদ এবং বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ১১ দলীয় জোটের এই দাবি শুধু ভোট পুনঃগণনার জন্য নয়, বরং দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জনগণের আস্থা বজায় রাখার একটি গুরুত্বপুর্ণ সংকেত। দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যাতে ভবিষ্যতে নির্বাচনী প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হয়।
এ ঘটনার প্রেক্ষিতে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, নির্বাচনকালীন সময়ে বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোটের অস্বাভাবিকতার ঘটনা এবং ফলাফল শিটে ঘষামাজার অভিযোগ জাতীয় রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। এই বিতর্কের সমাধান যদি সুষ্ঠুভাবে না হয়, তবে তা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে।
১১ দলীয় জোটের নেতারা এদিন ইসি কর্মকর্তাদের কাছে নির্বাচনের সময়ে সংঘটিত অনিয়মের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করেন। তারা দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রে পুনঃগণনা এবং অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। এতে দেশের জনগণ পুনরায় নির্বাচনের প্রতি আস্থা ফিরে পাবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এমন অভিযোগ এবং ভোট পুনঃগণনার দাবি সাধারণত নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে এই দাবির সফলতা নির্ভর করছে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার ওপর।
সমগ্র পরিস্থিতি দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ১১ দলীয় ঐক্যের এই উদ্যোগ ভোটের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং ভবিষ্যতের নির্বাচনের জন্য নীতি নির্ধারণে একটি প্রভাবশালী precedent হিসেবে কাজ করতে পারে।