প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের মানুষের খাদ্যসংস্কৃতিতে তেঁতুল এক অনন্য নাম। টক স্বাদের এই ফলটি শুধু খাবারের স্বাদ বাড়ায় না, বরং শৈশবের স্মৃতির সঙ্গেও জড়িয়ে আছে গভীরভাবে। গ্রামবাংলার কাঁচা তেঁতুল, শহরের ফুচকা বা চটপটির টক পানি, কিংবা ঘরোয়া আচার—সব জায়গাতেই তেঁতুলের উপস্থিতি লক্ষণীয়। তবে এই জনপ্রিয় ফলটি যতটা উপকারী, ততটাই কিছু ক্ষেত্রে ক্ষতিকরও হতে পারে—বিশেষ করে যখন এটি মাত্রাতিরিক্ত খাওয়া হয়। পুষ্টিবিদ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেঁতুলের উপকারিতা যেমন রয়েছে, তেমনি এর অপকারিতার দিকগুলো সম্পর্কেও সচেতন থাকা জরুরি।
তেঁতুলের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো। প্রাচীনকাল থেকেই এটি খাদ্য ও ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আয়ুর্বেদ ও লোকজ চিকিৎসায় তেঁতুলের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন সি, ফাইবার, পটাশিয়াম এবং বিভিন্ন জৈব অ্যাসিড, যা শরীরের নানা উপকারে আসে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তেঁতুল হজমশক্তি বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। এতে থাকা ফাইবার অন্ত্রের কার্যক্রমকে সহজ করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সহায়তা করে। অনেক ক্ষেত্রে এটি প্রাকৃতিক ল্যাক্সেটিভ হিসেবে কাজ করে।
ওজন নিয়ন্ত্রণেও তেঁতুলের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। তেঁতুল শরীরের অতিরিক্ত চর্বি কমাতে সাহায্য করতে পারে বলে ধারণা করা হয়। এর উপাদানগুলো শরীরের খারাপ কোলেস্টেরল কমিয়ে ভালো কোলেস্টেরল বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে। ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রেও এটি উপকারী হতে পারে। হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে তেঁতুলের এই ভূমিকা অনেকের কাছে আশাব্যঞ্জক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
লিভারের সুরক্ষাতেও তেঁতুলের সম্ভাব্য উপকারিতা নিয়ে গবেষণা হয়েছে। এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে সহায়তা করে এবং লিভারকে ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিকালের প্রভাব থেকে কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে। একই সঙ্গে তেঁতুলে থাকা অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদান শরীরের প্রদাহ কমাতে সহায়ক হতে পারে। গলা ব্যথা বা জয়েন্টের ব্যথার মতো সমস্যায় অনেকেই তেঁতুলের ঘরোয়া ব্যবহার করে থাকেন।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতেও তেঁতুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এতে থাকা ভিটামিন সি শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করে। সর্দি, কাশি বা মৌসুমি ফ্লুর সময় অনেকেই তেঁতুলের শরবত বা খাবার গ্রহণ করে থাকেন। তেঁতুলের নির্যাস চোখের কিছু চিকিৎসায় ব্যবহারের কথাও উল্লেখ রয়েছে, বিশেষ করে ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসায়।
ত্বকের ক্ষেত্রেও তেঁতুলের কিছু ইতিবাচক প্রভাবের কথা বলা হয়। এটি ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে বলে ধারণা করা হয়। কিছু প্রাকৃতিক স্কিনকেয়ার উপাদানেও তেঁতুল ব্যবহার করা হয়। এছাড়া জন্ডিস বা কিছু হালকা শারীরিক দুর্বলতায় লোকজ চিকিৎসায় তেঁতুল ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে।
তবে এতসব উপকারিতার পাশাপাশি তেঁতুলের কিছু ক্ষতিকর দিকও রয়েছে, যা অনেকেই জানেন না বা গুরুত্ব দেন না। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত তেঁতুল খাওয়া শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তেঁতুল রক্তচাপ কমাতে সহায়তা করলেও অতিরিক্ত খেলে তা বিপজ্জনকভাবে কমে যেতে পারে। যাদের রক্তচাপ স্বাভাবিকের চেয়ে কম, তাদের ক্ষেত্রে এটি মাথা ঘোরা বা দুর্বলতার কারণ হতে পারে।
অ্যালার্জির ঝুঁকিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে তেঁতুল খাওয়ার ফলে অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। এর ফলে ত্বকে ফুসকুড়ি, চুলকানি, বমি, এমনকি শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তাই যাদের অ্যালার্জির ইতিহাস রয়েছে, তাদের তেঁতুল খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা উচিত।
রক্তপাতের ঝুঁকির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত তেঁতুল খাওয়া শরীরে রক্তপাতের প্রবণতা বাড়াতে পারে বলে কিছু গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে যারা রক্ত পাতলা করার ওষুধ গ্রহণ করেন, তাদের ক্ষেত্রে এটি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। একই সঙ্গে তেঁতুল শরীরের গ্লুকোজের মাত্রা কমিয়ে দিতে পারে, যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য কখনো কখনো সমস্যার কারণ হতে পারে, বিশেষ করে যদি তারা ওষুধ গ্রহণ করে থাকেন।
দাঁতের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও তেঁতুলের নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। তেঁতুলে থাকা টারটারিক অ্যাসিড দাঁতের এনামেল ক্ষয় করতে পারে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বেশি পরিমাণে তেঁতুল খেলে দাঁত সংবেদনশীল হয়ে যেতে পারে বা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেঁতুল একটি পুষ্টিকর ফল হলেও এটি পরিমিত পরিমাণে খাওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ। কোনো খাবারই অতিরিক্ত খাওয়া উচিত নয়, তেঁতুলও তার ব্যতিক্রম নয়। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজন সুষম খাদ্যাভ্যাস, যেখানে সব ধরনের পুষ্টিকর খাবার নির্দিষ্ট পরিমাণে গ্রহণ করা হয়।
বাংলাদেশের খাদ্যসংস্কৃতিতে তেঁতুলের জনপ্রিয়তা অনেক পুরোনো এবং এটি সহজেই পাওয়া যায়। তাই এটি খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে, তবে সচেতনভাবে এবং সীমিত পরিমাণে। বিশেষ করে যারা নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ করেন বা বিশেষ কোনো রোগে ভুগছেন, তাদের তেঁতুল খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সবশেষে বলা যায়, তেঁতুল যেমন সুস্বাদু, তেমনি উপকারী। তবে এর সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন না হলে এটি উপকারের বদলে ক্ষতির কারণও হতে পারে। তাই তেঁতুল খাওয়ার ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখা এবং নিজের শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।