নির্বাচনের পর ৩০ জেলায় সহিংসতা, নিহত ১: এইচআরএসএস

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৪ বার
নির্বাচনের পর ৩০ জেলায় সহিংসতা, নিহত ১: এইচআরএসএস

প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে ভোটের দিন সারাদেশে তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ পরিবেশের প্রশংসা থাকলেও নির্বাচন-পরবর্তী বাস্তবতায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক এক চিত্র। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) জানিয়েছে, নির্বাচন শেষে দেশের অন্তত ৩০টি জেলায় দুই শতাধিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় একজন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। একই সঙ্গে নির্বাচনের আগে ও পরে সহিংসতার মোট চিত্র আরও ভয়াবহ বলে উল্লেখ করেছে সংগঠনটি।

রোববার দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে এই তথ্য তুলে ধরা হয়। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে মানবাধিকার পরিস্থিতি, ভোটের পরিবেশ, সহিংসতার ধরন এবং পর্যবেক্ষকদের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।

সংগঠনটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামগ্রিকভাবে ভোটগ্রহণের দিন দেশের অধিকাংশ স্থানে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল উৎসবমুখর এবং শান্তিপূর্ণ। দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতার অভিজ্ঞতা থাকা দেশের জন্য এই পরিবেশ অনেকের কাছেই স্বস্তির ছিল। ভোটকেন্দ্রে নারী ও তরুণ ভোটারদের অংশগ্রহণ বিশেষভাবে দৃশ্যমান ছিল, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তবে ভোটের দিন তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ পরিবেশ থাকলেও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এইচআরএসএস। সংগঠনটির ভাষ্য অনুযায়ী, ফলাফল ঘোষণার পরপরই বিভিন্ন এলাকায় বিজয় মিছিল, প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষ, বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর এবং শারীরিক আক্রমণের ঘটনা ঘটে। এসব সহিংসতায় অন্তত একজন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন তিন শতাধিক মানুষ। আহতদের মধ্যে অনেকেই গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।

সংবাদ সম্মেলনে এইচআরএসএসের প্রতিনিধিরা বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার শিকার হয়েছেন শুধু রাজনৈতিক কর্মীরাই নন, অনেক সাধারণ মানুষও এর শিকার হয়েছেন। কিছু এলাকায় ভোটের ফলাফলকে কেন্দ্র করে প্রতিশোধমূলক হামলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নির্বাচন পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার সময় সংগঠনটির অনেক পর্যবেক্ষক বিভিন্ন ধরনের বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। কমপক্ষে ৪৮ জন পর্যবেক্ষক ভোট গণনা কক্ষে প্রবেশ করতে পারেননি বা প্রবেশে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। কিছু ক্ষেত্রে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে অনুমতি না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে প্রার্থীদের সমর্থকদের বাধার মুখে পড়েছেন পর্যবেক্ষকরা।

এইচআরএসএসের মতে, ভোট গণনা প্রক্রিয়া একটি নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই প্রক্রিয়ায় পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কিন্তু পর্যবেক্ষকদের বাধা দেওয়া হলে নির্বাচন নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। সংগঠনটি এ ধরনের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, অন্তত ২১টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ বা পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমে কিছু অনিয়মের প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। এসব অনিয়মের মধ্যে ভোট গণনায় স্বচ্ছতার অভাব, পর্যবেক্ষকদের প্রবেশে বাধা এবং কিছু ক্ষেত্রে কেন্দ্রের পরিবেশ নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। তবে সংগঠনটি এটিও বলেছে যে, এসব অনিয়ম সব কেন্দ্রের চিত্র নয় এবং সামগ্রিকভাবে অধিকাংশ কেন্দ্রেই ভোটগ্রহণ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

নির্বাচনের আগের সময়টিও সহিংসতায় পরিপূর্ণ ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর থেকে ভোটের আগ পর্যন্ত মোট ২৫৪টি সহিংসতার ঘটনায় পাঁচজন নিহত এবং প্রায় ১৬৫০ জন আহত হয়েছেন। এসব ঘটনার মধ্যে ছিল রাজনৈতিক সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর এবং বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা। এতে নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।

এইচআরএসএস বলছে, নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। তাই নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য নয়, পুরো দেশের জন্য ক্ষতিকর। সহিংসতার কারণে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থা কমে যেতে পারে।

সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির নেতারা বলেন, নির্বাচনের দিন শান্তিপূর্ণ পরিবেশ থাকলেও নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

মানবাধিকার বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ব্যক্তিগত বা সামাজিক সংঘর্ষে রূপ নেয়। ফলে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এই প্রবণতা বন্ধ করতে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যকর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্লেষকদের মতে, একটি নির্বাচন শুধু ভোটের দিন শান্তিপূর্ণ হলেই যথেষ্ট নয়, বরং নির্বাচন-পূর্ব এবং নির্বাচন-পরবর্তী সময়ও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পুরো প্রক্রিয়াটি যদি সহিংসতামুক্ত থাকে, তবেই একটি নির্বাচন সত্যিকার অর্থে সফল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এইচআরএসএস তাদের প্রতিবেদনে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। তারা বলেছে, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে নির্বাচন ঘিরে সব ধরনের সহিংসতা বন্ধ করতে হবে এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ভোটের দিন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হলেও নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন সব পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত