বরফের সমুদ্রেই গাড়ি চলাচল, বিস্ময় এস্তোনিয়ায়

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫ বার
বরফের সমুদ্রেই গাড়ি চলাচল, বিস্ময় এস্তোনিয়ায়

প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

শীতের প্রকোপ কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তার এক জীবন্ত উদাহরণ এখন ইউরোপের উত্তরাঞ্চলের দেশ এস্তোনিয়া। সেখানে এমন এক বিস্ময়কর দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, যা অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। বিশাল সমুদ্র, যার বুক চিরে ঢেউ খেলার কথা, সেটিই এখন শক্ত বরফের চাদরে ঢেকে গেছে। আর সেই জমাট বরফের ওপর দিয়েই চলছে গাড়ি, মানুষ যাতায়াত করছে এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে। প্রকৃতির এই অনন্য রূপ শুধু স্থানীয়দের জীবনযাত্রার অংশ নয়, বরং বিশ্বের মানুষের কাছেও এক বিস্ময়কর বাস্তবতা হয়ে উঠেছে।

এবারের শীতে উত্তর ইউরোপজুড়ে তাপমাত্রা নেমে গেছে অস্বাভাবিকভাবে নিচে। টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে তাপমাত্রা মাইনাস ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকায় শুধু নদী বা হ্রদ নয়, সমুদ্রের পানিও জমে শক্ত বরফে পরিণত হয়েছে। পশ্চিম এস্তোনিয়ার দুটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ, সারেমা দ্বীপ এবং হিউমা দ্বীপ-এর মাঝখানে তৈরি হয়েছে প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এক প্রাকৃতিক সড়ক। এই বরফের সড়কটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘আইস রোড’, যা এখন স্থানীয়দের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

গত সপ্তাহে আনুষ্ঠানিকভাবে এই আইস রোড খুলে দেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরপরই দেখা যায়, স্থানীয়রা গাড়ি নিয়ে বরফের ওপর দিয়ে চলাচল শুরু করেছেন। বরফের এই রাস্তা যেন হঠাৎ করে তৈরি হওয়া কোনো অলৌকিক পথ, যা কয়েক সপ্তাহ আগেও ছিল উত্তাল সমুদ্র। এখন সেই সমুদ্রই পরিণত হয়েছে মানুষের যাতায়াতের নিরাপদ পথ হিসেবে।

এই আইস রোড চালু হওয়ার পেছনে রয়েছে বাস্তব প্রয়োজন। হিউমা দ্বীপে বসবাস করেন প্রায় ৯ হাজার মানুষ। তাদের দৈনন্দিন জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য পাশের বড় দ্বীপ সারেমায় যেতে হয়। শিশুদের স্কুলে পৌঁছে দেওয়া, চিকিৎসা সেবা নেওয়া, বাজার করা কিংবা সামাজিক যোগাযোগ—সবকিছুর জন্যই এই যাতায়াত অপরিহার্য। সারেমা দ্বীপে প্রায় ৩১ হাজার মানুষের বসবাস, যেখানে রয়েছে উন্নত সুযোগ-সুবিধা। ফলে হিউমার বাসিন্দাদের কাছে এই বরফের রাস্তা শুধু একটি পথ নয়, বরং জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

শীতের কারণে ফেরি চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। সমুদ্র জমে যাওয়ায় ফেরি চলা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে বিকল্প হিসেবে আইস রোড খুলে দেওয়া হয়, যাতে মানুষ তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা চালিয়ে যেতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন বরফের পুরুত্ব, নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত ঝুঁকি পরীক্ষা করেই এই রাস্তা চালুর অনুমতি দেয়।

তবে এই আইস রোড শুধুমাত্র প্রয়োজনের জন্যই নয়, এটি স্থানীয় সংস্কৃতিরও একটি অংশ। হিউমা দ্বীপের মেয়র হারগো তাসুয়া বলেছেন, শীতের এই বরফ তাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এখানকার মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করে আসছে। গ্রীষ্মকালে তারা সমুদ্রে সাঁতার কাটে, নৌকায় ভ্রমণ করে, আর শীতকালে সেই একই সমুদ্রের ওপর হাঁটে বা গাড়ি চালায়। এই অভিজ্ঞতা তাদের জীবনের এক অনন্য অংশ।

আইস রোডে চলাচলের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম রয়েছে। নিরাপত্তার জন্য নির্দিষ্ট ওজনের বেশি গাড়ি চলাচলের অনুমতি নেই। সর্বোচ্চ আড়াই টন ওজনের গাড়ি চলতে পারবে। এছাড়া গাড়ির গতি নিয়েও রয়েছে বিশেষ নির্দেশনা। খুব ধীরে বা নির্দিষ্ট গতির বাইরে গাড়ি চালানো যাবে না, কারণ এতে বরফে কম্পন সৃষ্টি হতে পারে, যা রাস্তার স্থায়িত্বের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

এই আইস রোড শুধু যাতায়াতের পথ নয়, এটি প্রকৃতির এক অসাধারণ উদাহরণ, যা মানুষকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। প্রকৃতির শক্তি এবং মানুষের অভিযোজন ক্ষমতার এই মিলন মানবজীবনের এক অনন্য গল্প তুলে ধরে। যেখানে প্রতিকূল পরিবেশকে জয় করে মানুষ নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী জীবনকে সাজিয়ে নেয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অনেক পর্যটকও এই আইস রোড দেখতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। বরফের ওপর দিয়ে গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা অনেকের কাছেই রোমাঞ্চকর। তবে স্থানীয় প্রশাসন সবসময় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকে, যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের আইস রোড তৈরি হওয়া নির্ভর করে তাপমাত্রা, বরফের পুরুত্ব এবং আবহাওয়ার স্থিতিশীলতার ওপর। তাপমাত্রা বেড়ে গেলে বরফ গলতে শুরু করে এবং তখন এই রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে এটি একটি অস্থায়ী পথ, যা শুধুমাত্র শীতকালেই ব্যবহার করা যায়।

প্রকৃতির এই বিস্ময় আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবী কতটা বৈচিত্র্যময় এবং কতভাবে মানুষ পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়। যেখানে বাংলাদেশের মতো উষ্ণ দেশের মানুষের কাছে বরফের সমুদ্র কল্পনাতীত, সেখানে এস্তোনিয়ার মানুষের কাছে এটি বাস্তবতার অংশ।

বরফের ওপর দিয়ে চলা এই গাড়িগুলো যেন এক নতুন গল্পের প্রতীক—প্রকৃতি এবং মানুষের সহাবস্থানের গল্প। যেখানে কঠিন শীতও মানুষের জীবন থামাতে পারে না, বরং নতুন পথ তৈরি করে দেয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত