ফকিরহাটে ভয়াবহ বাস সংঘর্ষ, আহত অন্তত ১৫

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৪ বার
ফকিরহাটে ভয়াবহ বাস সংঘর্ষ, আহত অন্তত ১৫

প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। কেউ যাচ্ছিলেন কর্মস্থলে, কেউ ফিরছিলেন বাড়ি, কেউবা ছিলেন দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি নিয়ে গন্তব্যের অপেক্ষায়। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু বদলে যায়। বিকট শব্দ, আতঙ্কিত চিৎকার আর ধুলোর মেঘে ঢেকে যায় চারপাশ। বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট উপজেলার বিশ্বরোড মোড়ে দুটি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে আহত হন অন্তত ১৫ জন। একটি স্বাভাবিক সকাল পরিণত হয় আতঙ্ক আর কষ্টের স্মৃতিতে।

রোববার সকাল ১০টার দিকে খুলনা-ঢাকা মহাসড়কে ঘটে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সংঘর্ষটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে মুহূর্তের মধ্যে বাস দুটির সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে যায়। বাসের ভেতরে থাকা যাত্রীরা ছিটকে পড়েন সিট থেকে, কেউ মাথায় আঘাত পান, কেউ হাত-পা ভেঙে যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকেন। দুর্ঘটনার পরপরই চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক ও আর্তনাদ।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা খুলনাগামী বিএম লাইন পরিবহন বাসটি বিশ্বরোড মোড়ে পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা মাদারীপুরগামী রূপসী পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ হয়। ধারণা করা হচ্ছে, গতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়া বা ওভারটেকিংয়ের চেষ্টা এই দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। যদিও তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে কিছু বলতে চাননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

দুর্ঘটনায় আহতদের মধ্যে রয়েছেন ব্যাংক কর্মকর্তা মানবেন্দ্র নারায়ণ সরকার, নাছিমা বেগম, শিল্পী মণ্ডল, রাজিয়া বেগম, সোনিয়া আক্তার, নিরঞ্জন কুমার দাশ, হালিমা বেগম, মিনতী রানী ঢালী এবং কপিল রায়সহ আরও কয়েকজন। আহতদের অনেকেই ছিলেন রূপসী বাসের যাত্রী। তাদের মধ্যে কয়েকজন গুরুতর আহত হওয়ায় দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়।

দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয় মানুষ ছুটে আসেন উদ্ধার কাজে। কেউ বাসের ভাঙা জানালা দিয়ে যাত্রীদের বের করে আনেন, কেউ পানি এনে দেন, কেউ আবার আহতদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। দুর্ঘটনার কয়েক মিনিটের মধ্যেই খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স-এর একটি উদ্ধারকারী দল। তারা দ্রুত আহতদের উদ্ধার করে ফকিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।

বাগেরহাট ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক মো. বজলুর রহমান জানান, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কাজ শুরু করে। আহতদের মধ্যে ছয়জন নারী এবং নয়জন পুরুষ রয়েছেন। তাদের অনেকেই শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন এবং তীব্র মানসিক আঘাতেও ছিলেন। উদ্ধারকর্মীরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন দ্রুত তাদের হাসপাতালে পৌঁছে দিতে।

দুর্ঘটনার কারণে খুলনা-ঢাকা মহাসড়কে প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। এতে সড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। যাত্রীবাহী বাস, ট্রাক, প্রাইভেটকার—সব ধরনের যানবাহন আটকা পড়ে। অনেক যাত্রী বাস থেকে নেমে হেঁটে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কেউ ফোন করে পরিবারের সদস্যদের দুর্ঘটনার খবর জানান, কেউ আবার আতঙ্কে নীরবে অপেক্ষা করেন রাস্তা স্বাভাবিক হওয়ার।

পরে পুলিশ ও উদ্ধারকারী দল বাস দুটি সড়ক থেকে সরিয়ে নিলে ধীরে ধীরে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। বাংলাদেশ পুলিশ-এর মোল্লাহাট হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান হাওলাদার বলেন, সংঘর্ষে বাস দুটির সামনের অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ায় বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি, যা কিছুটা স্বস্তির বিষয়।

হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, আহতদের অনেকেই এখনো ভীত ও আতঙ্কিত। কেউ নিজের পরিবারের কথা ভাবছেন, কেউ আবার ভাবছেন কতটা ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে তারা বেঁচে ফিরেছেন। আহত মানবেন্দ্র নারায়ণ সরকার জানান, তিনি প্রতিদিনের মতোই অফিসের কাজে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ করেই প্রচণ্ড শব্দ শুনতে পান, তারপর আর কিছু মনে নেই। চোখ খুলে দেখেন, তিনি হাসপাতালে।

এ ধরনের দুর্ঘটনা শুধু শারীরিক আঘাতই নয়, মানসিক ট্রমাও তৈরি করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের অনেক সময় দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপ, ভয় এবং উদ্বেগের মধ্যে থাকতে হয়। তাই তাদের শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক সহায়তাও প্রয়োজন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, এই মহাসড়কে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। অতিরিক্ত গতি, অসতর্ক ড্রাইভিং এবং নিয়ম না মানার কারণে এ ধরনের ঘটনা বাড়ছে। তারা সড়কে কঠোর নজরদারি এবং আইন প্রয়োগের দাবি জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা কমানো যায়।

সড়ক দুর্ঘটনা বাংলাদেশের একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়। এতে অনেক পরিবার হারাচ্ছে তাদের প্রিয়জন, কেউ হারাচ্ছেন কর্মক্ষমতা, কেউবা চিরদিনের জন্য পঙ্গু হয়ে যাচ্ছেন। এই বাস্তবতা শুধু সংখ্যা নয়, এটি অসংখ্য পরিবারের কান্না এবং বেদনার গল্প।

এই দুর্ঘটনাও সেই একই বাস্তবতার একটি অংশ। যেখানে কয়েক সেকেন্ডের অসতর্কতা বদলে দিতে পারে অনেক মানুষের জীবন। যারা আহত হয়েছেন, তারা হয়তো আবার সুস্থ হয়ে উঠবেন, কিন্তু এই দিনের স্মৃতি তাদের জীবনে চিরকাল থেকে যাবে।

দুর্ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসন ঘটনাটি তদন্ত শুরু করেছে। তারা দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন।

এই দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দেয়, সড়কে নিরাপত্তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু চালকের নয়, যাত্রী, পথচারী এবং সংশ্লিষ্ট সবার সচেতনতা প্রয়োজন। কারণ সড়কে এক মুহূর্তের ভুল সিদ্ধান্তই ডেকে আনতে পারে বড় বিপর্যয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত