প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘদিন ধরে দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ময়মনসিংহ এবার এক নতুন ইতিহাসের সাক্ষী হলো। স্বাধীনতার পর থেকে প্রতিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই জেলার কোনো না কোনো আসনে অভিজ্ঞ কিংবা সাবেক সংসদ সদস্যদের উপস্থিতি ছিল দৃশ্যমান। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই ধারায় বড় পরিবর্তন এসেছে। এবার জেলার ১১টি সংসদীয় আসন থেকেই নির্বাচিত হয়েছেন একেবারে নতুন মুখ, যাদের কেউই এর আগে জাতীয় সংসদের সদস্য ছিলেন না। ফলে নতুন এই প্রতিনিধিদের ঘিরে যেমন তৈরি হয়েছে আশার আলো, তেমনি মানুষের প্রত্যাশার ভারও এসে পড়েছে তাদের কাঁধে।
এই নির্বাচনে জেলার ১১টি আসনের মধ্যে ৮টিতেই জয় পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। এছাড়া একটি আসনে জয়ী হয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত প্রার্থী, একটি আসনে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এবং একটি আসনে জয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। এই ফলাফল শুধু রাজনৈতিক সমীকরণেই পরিবর্তন আনেনি, বরং নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও নতুন প্রজন্মের উত্থানের বার্তা দিয়েছে।
ময়মনসিংহ-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয়ী হয়েছেন সালমান ওমর রুবেল। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এই তরুণ নেতা জীবনের প্রথম নির্বাচনে অংশ নিয়েই জয়ী হয়েছেন। স্থানীয় ভোটারদের মতে, তারুণ্য, সাহসী সিদ্ধান্ত এবং মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কই তাকে এই বিজয় এনে দিয়েছে।
ময়মনসিংহ-২ আসনে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুহাম্মদুল্লাহর বিজয়ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রথমবারের মতো নির্বাচনে অংশ নিয়েই তিনি জয়ী হয়েছেন। এলাকাবাসী বলছেন, দীর্ঘদিনের সামাজিক কাজ এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ তাকে এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
ময়মনসিংহ-৩ আসনে বিএনপির এম ইকবাল হোসেন, ময়মনসিংহ-৪ আসনে আবু ওয়াহাব আকন্দ, ময়মনসিংহ-৫ আসনে জাকির হোসেন, ময়মনসিংহ-৭ আসনে মাহবুবুর রহমান, ময়মনসিংহ-৮ আসনে লুৎফুল্লাহেল মাজেদ, ময়মনসিংহ-৯ আসনে ইয়াসের খান চৌধুরী, ময়মনসিংহ-১০ আসনে আক্তারুজ্জামান এবং ময়মনসিংহ-১১ আসনে ফখর উদ্দিন আহমেদ বিজয়ী হয়েছেন। অন্যদিকে ময়মনসিংহ-৬ আসনে জামায়াতের কামরুল হাসান জয় লাভ করেছেন।
এই নির্বাচনে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে এমন কিছু আসন, যেখানে সাবেক এমপি বা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হারিয়ে নতুনরা জয় পেয়েছেন। এতে করে সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে আশা তৈরি হয়েছে।
নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকেই জেলার বিভিন্ন এলাকায় উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা এলাকায় গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন এবং নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আশ্বাস দিচ্ছেন।
ময়মনসিংহ সদর আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ বলেন, তিনি ময়মনসিংহ শহরের দীর্ঘদিনের অবহেলা দূর করতে চান। তিনি মনে করেন, এই শহরের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। তিনি বলেন, জনগণ তাকে যে আস্থা দিয়েছে, তা তিনি উন্নয়নের মাধ্যমে ফিরিয়ে দিতে চান।
মুক্তাগাছা আসনের সংসদ সদস্য জাকির হোসেন বাবলু বলেন, তিনি প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে চান। তার মতে, উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন সব রাজনৈতিক মতের মানুষ একসঙ্গে কাজ করবে।
ঈশ্বরগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ তরুণদের কর্মসংস্থানকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে চান। তিনি জানান, প্রযুক্তিনির্ভর কাজ যেমন ডাটা অ্যানোটেশন ও ডিজিটাল আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে হাজার হাজার তরুণের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। তিনি ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক কিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছেন বলে জানান।
ফুলবাড়িয়া আসনের সংসদ সদস্য কামরুল হাসান বলেন, তিনি নিজেকে সংসদ সদস্য নয়, বরং জনগণের সেবক হিসেবে দেখতে চান। তিনি এলাকার মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি নির্মূল করে একটি নিরাপদ সমাজ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
এদিকে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও কম নয়। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, তারা শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বাস্তব উন্নয়ন দেখতে চান। বিশেষ করে সড়ক, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এখন তাদের প্রধান দাবি।
ময়মনসিংহ শহরের একজন ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা অনেক প্রতিশ্রুতি শুনেছি। এবার আমরা কাজ দেখতে চাই। নতুনরা এসেছে, তারা যদি সত্যিই আন্তরিক হয়, তাহলে পরিবর্তন সম্ভব।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন নেতৃত্বের এই উত্থান দেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। নতুনরা সাধারণত নিজেদের প্রমাণ করতে বেশি আগ্রহী থাকেন, ফলে উন্নয়নের ক্ষেত্রে তারা বেশি সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারেন।
তবে একই সঙ্গে তাদের জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জও। কারণ মানুষের প্রত্যাশা এখন অনেক বেশি। নির্বাচনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে না পারলে জনগণের আস্থা ধরে রাখা কঠিন হবে।
ময়মনসিংহের এই নতুন ১১ সংসদ সদস্য এখন শুধু তাদের নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধিই নন, তারা একটি নতুন সময়ের প্রতীক। তাদের সফলতা বা ব্যর্থতা শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং পুরো অঞ্চলের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
মানুষ এখন অপেক্ষা করছে, নির্বাচনের উত্তেজনা শেষে বাস্তব উন্নয়নের যাত্রা কত দ্রুত শুরু হয় এবং নতুন এই প্রতিনিধিরা কতটা সফলভাবে তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারেন।