প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজনৈতিক পালাবদলের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হয়েছে, নতুন সরকার গঠনের প্রস্তুতি চলছে, আর এই পরিবর্তনের মধ্যবর্তী সময়টিতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা। এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বের সময়সীমা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। সেই প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
রোববার দুপুরে বাংলাদেশ সচিবালয়-এ সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি স্পষ্টভাবে জানান, নতুন সরকার শপথ না নেওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা তাদের দায়িত্ব পালন করে যাবেন। অর্থাৎ ক্ষমতা হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার দায়িত্ব তাদের ওপরই থাকবে।
তিনি বলেন, একটি নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেছেন এবং এখন সেই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে সরকার গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। এই সময়টিতে রাষ্ট্র পরিচালনায় কোনো শূন্যতা তৈরি না হয়, সেটি নিশ্চিত করাই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান দায়িত্ব। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রাখা, জনগণের সেবা অব্যাহত রাখা এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা—এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েই উপদেষ্টারা কাজ করছেন।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান আরও জানান, সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানে উপদেষ্টারা উপস্থিত থাকবেন না। কারণ সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ। তবে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানে উপদেষ্টারা উপস্থিত থাকবেন, যা ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী ধাপ হিসেবে বিবেচিত হয়।
নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠান কোথায় অনুষ্ঠিত হবে, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তিনি জানান, নির্বাচিত রাজনৈতিক দলের অনুরোধের ভিত্তিতেই ঐতিহ্যবাহী বঙ্গভবন-এর পরিবর্তে জাতীয় সংসদ ভবন-এর দক্ষিণ প্লাজায় শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নতুন সরকার সংসদকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতি তাদের অঙ্গীকারের একটি প্রতীকী বার্তা দিতে চায় বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
শপথ অনুষ্ঠানে বিদেশি অতিথিদের উপস্থিতি সম্পর্কেও তথ্য দিয়েছেন তিনি। সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে সরকারের পক্ষ থেকে মূলত দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বা সার্কভুক্ত দেশগুলোর প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এর মাধ্যমে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়ার একটি বার্তা দেওয়া হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তিনি নতুন সরকারের সম্ভাব্য মন্ত্রীদের আগাম শুভেচ্ছা জানান এবং বলেন, নতুন দায়িত্বপ্রাপ্তরা যদি কোনো সহযোগিতা চান, তাহলে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হবে। তিনি বলেন, “দেশের একটি সংকটময় সময়ে আমাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। আমরা চেষ্টা করেছি সৎভাবে এবং দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সেই দায়িত্ব পালন করতে। এখন নতুন সরকার আসছে, আমরা চাই তারা যেন একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তাদের কাজ শুরু করতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বকাল ছিল একটি কঠিন পরীক্ষা। রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ এবং জনমনে অনিশ্চয়তার মধ্যেও তারা দেশের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, জনগণ তাদের এই প্রচেষ্টার মূল্যায়ন করবে।
সাম্প্রতিক একটি সংবেদনশীল ঘটনার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে এক নারীর ওপর সংঘটিত অন্যায়ের বিষয়ে সরকার অবগত রয়েছে এবং তার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, সরকার সেই নারীকে সর্বোচ্চ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে প্রশাসনকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব-এর বিষয়ে ছড়ানো গুজব নিয়েও কথা বলেন সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেন, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব যে সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়েছেন, তা অনেকের স্বার্থে আঘাত করেছে। ফলে একটি মহল তার বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, “সংস্কার মানেই কিছু মানুষের স্বার্থে আঘাত লাগা। কিন্তু দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এই সংস্কার প্রয়োজন। আমরা বিশ্বাস করি, সময়ই প্রমাণ করবে কোনটি সঠিক ছিল।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের এই অবস্থান দেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ক্ষমতা হস্তান্তরের এই সময়টি সবসময়ই সংবেদনশীল হয়ে থাকে। এই সময় প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং নতুন সরকারের জন্য একটি কার্যকর ভিত্তি তৈরি করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
এদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও নতুন সরকার নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। তারা আশা করছেন, নতুন সরকার দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের দায়িত্ব পালন অব্যাহত থাকার ঘোষণার মাধ্যমে অন্তত একটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে—দেশে প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হবে না এবং একটি সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই ক্ষমতা হস্তান্তর সম্পন্ন হবে।
এখন পুরো দেশের দৃষ্টি নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের দিকে। সেই শপথের মধ্য দিয়েই শুরু হবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের আরেকটি নতুন অধ্যায়।