প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইসলামের ইতিহাসে জনসেবা ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে খলিফা হজরত উমর উমর ইবনে খাত্তাব রা রা.-এর অবদান চিরকাল স্মরণীয়। তিনি শুধু শাসকই ছিলেন না, বরং সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোই তার জীবনের মূল লক্ষ্য ছিল। ইসলামের প্রাচীন ইতিহাস থেকে জানা যায়, উমর রা. ছিলেন এক আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক, যিনি মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের কল্যাণে নিবেদিত ছিলেন। তার শাসনামলে যে মানবিক মূল্যবোধ এবং প্রশাসনিক নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল, তা আজও রাষ্ট্র পরিচালনার দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে।
উমর রা.-এর জীবন ও কর্ম সংকলিত গ্রন্থ ‘আলফারুক’ এ উল্লেখিত বহু দৃষ্টান্ত আমাদের জন্য শিক্ষণীয়। বিশেষ করে জনকল্যাণমূলক নীতি ও সাধারণ মানুষের প্রতি তার আন্তরিক দৃষ্টি রাষ্ট্র পরিচালনায় এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত। তিনি প্রতিটি সিদ্ধান্তে মানুষের কল্যাণকে প্রাধান্য দিতেন এবং সরকারি সম্পদ ব্যবহার করেও সাধারণ মানুষের জীবনে সরাসরি সহায়তা পৌঁছাতেন।
একটি প্রামাণ্য ঘটনা উমর রা.-এর এই মানবিক নীতির স্পষ্ট পরিচয় বহন করে। এক শীতের রাতে, মদিনার পথে নিয়মিত টহল দেওয়ার সময় খলিফা হজরত উমর রা. শুনলেন শিশুদের কান্নার শব্দ। শব্দ অনুসরণ করে তিনি এক বিধবার বাড়িতে পৌঁছালেন। দেখলেন, অতি দরিদ্র ওই পরিবারে সন্তানরা ক্ষুধার্ত। তারা ঘুমাতে চাচ্ছিল, কিন্তু খিদের জ্বালায় কাঁদছিল। জ্বলন্ত চুলায় যে হাড়ি রাখা হয়েছে, তাতে আসলে কয়েকটি নুড়ি পাথর ছিল, যা বাচ্চাদের বিভ্রান্ত করতে ব্যবহৃত হচ্ছিল।
এই দৃশ্য দেখে উমর রা. ভীষণভাবে দুঃখিত হন। তিনি দ্রুত বায়তুল মালে (রাষ্ট্রের কোষাগারে) ছুটে যান এবং নিজের পিঠে আটার বস্তা ও তেল বয়ে নিয়ে বাড়িতে পৌঁছে নিজের হাতে আগুন জ্বালিয়ে খাবার তৈরি করেন। তারপর বাচ্চাদের খাওয়ান এবং বিধবাকে নির্দেশ দেন, যে তিনি প্রতিদিন তার প্রয়োজনীয় খাবার বায়তুল মাল থেকে সংগ্রহ করতে পারবেন। এই ঘটনা কেবল একজন শাসকের দায়িত্ব নয়, বরং প্রকৃত জনসেবার এক মহান উদাহরণ।
এই ঘটনায় শিক্ষণীয় বিষয় হলো, রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্বশীল থাকা মানে শুধুমাত্র প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা নয়, বরং সাধারণ মানুষের সমস্যার প্রতি সহানুভূতি দেখানো, তাদের ক্ষুধা ও কষ্ট দূর করার চেষ্টা করা। এটি রাষ্ট্রের সেবক হিসেবে একজন শাসকের নৈতিক দায়িত্বের এক অনন্য উদাহরণ।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা মানব কল্যাণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। সূরা আলে ইমরান (৩:১১০)-এ বলা হয়েছে, “তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি। তোমাদেরকে বের করা হয়েছে, মানব কল্যাণের জন্য।” এই আধ্যাত্মিক নির্দেশ উমর রা.-এর কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছে।
উমর রা. নিজে একজন সাধারণ মানুষকে সহায়তা করতেন, তেমনি সরকারি সম্পদ ব্যবহার করেও জনগণের কল্যাণে অবদান রাখতেন। হাদিসে সাহাবি হজরত তামিম দারি রা. বর্ণনা করেছেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “দীন-ইসলাম হলো কল্যাণ কামনার নাম।” এই কল্যাণ শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, বরং সকলের জন্য প্রযোজ্য।
আজকের সমাজে এই ধরনের দৃষ্টান্ত রাষ্ট্র পরিচালনা ও নীতি নির্ধারণের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল অভিভাবকগণ যদি জনগণের পাশে দাঁড়ান, তাদের সাহায্য ও সহযোগিতার হাত বাড়ান, তবে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত, অসহায় নারী, পথশিশু এবং সাধারণ দিনমজুরদের জীবনমান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে।
উমর রা.-এর এই উদাহরণ আমাদের শিক্ষা দেয়, যে একজন শাসক বা রাষ্ট্রের অভিভাবক হলে শুধু শাসন কার্য চালানো যথেষ্ট নয়, মানবিক মূল্যবোধ ও জনকল্যাণমুখী কর্মকাণ্ডও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় অভিভাবকদেরই নয়, প্রতিটি সক্ষম ব্যক্তির জন্যও দায়িত্ব। আমাদের উচিত, নিজেদের ক্ষমতার সীমার মধ্যে অসহায়দের সহায়তা করা, তাদের অভিযোগের প্রতি মনোযোগী হওয়া এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা।
সংক্ষেপে বলা যায়, খলিফা হজরত উমর রা. এর জীবন ও কর্মকাণ্ড আজও আমাদের জন্য আদর্শ। তার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, জনকল্যাণমুখী নীতি এবং সৎ শাসনধারার শিক্ষা প্রতিটি রাষ্ট্রচিন্তক, সমাজ সংস্কারক এবং সাধারণ নাগরিকদের জন্য মূল্যবান। আমরা যদি তার প্রদর্শিত উদাহরণ অনুসরণ করি, তবে একটি কল্যাণমুখী, ন্যায়নিষ্ঠ এবং মানবতাপরায়ণ রাষ্ট্র গঠন সম্ভব হবে।