১৪ দিনে রেমিট্যান্স ১৬,৫৫৯ কোটি টাকা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১৭ বার
ফেব্রুয়ারির ১৪ দিনে রেমিট্যান্স এলো ১৬হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা

প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স নতুন বছরে আবারও ইতিবাচক প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। চলতি ফেব্রুয়ারির প্রথম ১৪ দিনে দেশে এসেছে ১৩৫ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ রেমিট্যান্স, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় দাঁড়ায় প্রায় ১৬ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। এই হিসাব প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৩০ পয়সা বিনিময় হার ধরে নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য জানিয়েছে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক, যা দেশের বৈদেশিক লেনদেন ও আর্থিক সূচকের প্রধান নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্রের দপ্তর থেকে রোববার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে প্রবাসী আয়ের এই প্রবাহ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মধ্যপ্রাচ্যসহ শ্রমবাজার নির্ভর দেশগুলোর পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ বিনিময় হার নীতির প্রভাব বিবেচনায় এই প্রবৃদ্ধি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে নানা সংকট থাকা সত্ত্বেও প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থের ধারা স্থিতিশীল রয়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও আমদানি ব্যয় সামলাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত সাত মাস ১৪ দিনে মোট প্রবাসী আয় এসেছে ২ হাজার ৭৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৭২৬ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ৪ শতাংশ, যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই প্রবৃদ্ধি শুধু সংখ্যাগত নয়; এটি দেশের শ্রমবাজার নীতিমালা, বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর উৎসাহমূলক উদ্যোগ এবং ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহারে প্রবাসীদের আগ্রহ বৃদ্ধির প্রতিফলন।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে সরকার যে প্রণোদনা ও নীতিগত সুবিধা দিয়েছে, তা প্রবাসীদের আস্থা বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠালে অতিরিক্ত নগদ প্রণোদনা পাওয়া, অনলাইন ও মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধা বিস্তৃত হওয়া এবং অবৈধ হুন্ডি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি—এসব পদক্ষেপ প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বাড়াতে সহায়ক হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈদেশিক কর্মসংস্থান বাজারে নতুন দেশ যুক্ত হওয়া এবং দক্ষ শ্রমিক রপ্তানির হার বাড়াও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলে। এটি একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করে, অন্যদিকে আমদানি ব্যয় মেটাতে সহায়তা করে এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা রাখে। অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য অনুযায়ী, রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়লে স্থানীয় বাজারে অর্থের সরবরাহ বৃদ্ধি পায়, যা ভোক্তা ব্যয় বাড়ায় এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আনে। ফলে সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, শুধু প্রবাহ বাড়লেই হবে না; এই অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি। তারা মনে করেন, প্রবাসী আয়ের একটি বড় অংশ ভোগ ব্যয়ে চলে যায়, যা স্বল্পমেয়াদে অর্থনীতিকে চাঙা করলেও দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার। যদি রেমিট্যান্সের উল্লেখযোগ্য অংশ শিল্প, কৃষি বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা যায়, তবে তা কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও টেকসই প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলে। অনেক পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস এই রেমিট্যান্স, যার মাধ্যমে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও জীবনমান উন্নত হয়। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে প্রবাসী আয়ের অর্থ দিয়ে ছোট ব্যবসা শুরু করা বা কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। এতে স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং দারিদ্র্য হ্রাসেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার প্রবাসী কল্যাণে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যেমন বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি এবং নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব উদ্যোগের ফলেই প্রবাসী কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। এছাড়া বৈদেশিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে দক্ষতা উন্নয়নকে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে অনেক দেশই মন্দা বা ধীরগতির প্রবৃদ্ধির চাপে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য রেমিট্যান্স একটি নির্ভরযোগ্য আর্থিক সহায়তা হিসেবে কাজ করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্য ওঠানামা, বৈদেশিক বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা কিংবা রপ্তানি আয়ের পরিবর্তনশীলতার মধ্যেও প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিকতা অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সামনে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে, যদি প্রবাসী কর্মীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা যায় এবং নতুন শ্রমবাজারে প্রবেশের কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা হয়। পাশাপাশি বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ ও কম খরচে করা গেলে প্রবাসীরা আরও বেশি উৎসাহিত হবেন। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রসার এবং ডিজিটাল লেনদেনের সুবিধা বাড়ানোও এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সব মিলিয়ে ফেব্রুয়ারির প্রথম দুই সপ্তাহে রেমিট্যান্স প্রবাহের ইতিবাচক পরিসংখ্যান দেশের অর্থনীতির জন্য আশাব্যঞ্জক বার্তা দিচ্ছে। বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মাঝেও প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের অন্যতম ভরসা হিসেবে অব্যাহত রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে এবং প্রবাসী কল্যাণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলে চলতি অর্থবছর শেষে রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত