খাবারেই মিলতে পারে মানসিক প্রশান্তির চাবিকাঠি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৭ বার
খাবারেই মিলতে পারে মানসিক প্রশান্তির চাবিকাঠি

প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, প্রতিযোগিতা, অনিশ্চয়তা এবং ব্যক্তিগত-পারিবারিক নানা টানাপোড়েন মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। প্রতিদিনের জীবনে দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ এবং মানসিক চাপ এখন অনেকটাই নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। কর্মক্ষেত্রে চাপ, আর্থিক অনিশ্চয়তা, পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা—সব মিলিয়ে অনেকেই মানসিক অস্থিরতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানসিক চাপ পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব না হলেও সঠিক জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে তা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। স্বাস্থ্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক তথ্যভিত্তিক ওয়েবসাইট Healthline-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রকৃতিতে এমন কিছু খাবার রয়েছে, যা শরীরের পাশাপাশি মনকেও শান্ত রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক চাপের সময় শরীরে কিছু হরমোনের পরিবর্তন ঘটে, বিশেষ করে কর্টিসল নামের হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। এর ফলে ঘুমের সমস্যা, ক্লান্তি, খিটখিটে মেজাজ এবং মনোযোগ কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। কিন্তু কিছু নির্দিষ্ট পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ খাবার শরীরের এই ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।

সবুজ শাকসবজি, বিশেষ করে পালংশাক, মানসিক চাপ কমাতে অত্যন্ত কার্যকর বলে মনে করা হয়। পালংশাকে প্রচুর ম্যাগনেসিয়াম থাকে, যা স্নায়ুকে শান্ত রাখতে সাহায্য করে। মানসিক চাপের সময় শরীরে ম্যাগনেসিয়ামের মাত্রা কমে যেতে পারে, ফলে উদ্বেগ বাড়ে। নিয়মিত পালংশাক খেলে শরীর এই ঘাটতি পূরণ করতে পারে এবং মানসিক স্থিতি ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করে।

একইভাবে তাজা সবজি ও ফল, যেমন গাজর, আপেল কিংবা কমলালেবু, মানসিক চাপ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শক্ত খাবার চিবিয়ে খাওয়ার সময় মস্তিষ্কের মনোযোগ অন্যদিকে সরে যায় এবং এতে মানসিক চাপ কিছুটা কমে। পাশাপাশি এসব খাবারে থাকা ভিটামিন ও অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।

বেরি জাতীয় ফল, যেমন ব্লুবেরি, স্ট্রবেরি বা ব্ল্যাকবেরি, মস্তিষ্কের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এসব ফলে থাকা ভিটামিন সি এবং অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট মস্তিষ্কের কোষকে সুরক্ষা দেয় এবং মানসিক ক্লান্তি কমাতে সাহায্য করে। নিয়মিত এসব ফল খেলে মস্তিষ্ক সতেজ থাকে এবং মন ভালো রাখতে সহায়তা করে।

মানসিক প্রশান্তির ক্ষেত্রে গ্রিন টি-ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গ্রিন টি বা ভেষজ চায়ে থাকা অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট স্নায়ুকে শান্ত রাখে এবং শরীরকে প্রশান্তি দেয়। অনেকেই দিনের শুরুতে বা কাজের ফাঁকে এক কাপ গ্রিন টি পান করে মানসিক স্বস্তি অনুভব করেন।

টক দইও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী খাবারের মধ্যে অন্যতম। এতে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়া অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে, যা সরাসরি মস্তিষ্কের সঙ্গে সম্পর্কিত। গবেষণায় দেখা গেছে, অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো থাকলে মানসিক অবস্থাও স্থিতিশীল থাকে।

ডার্ক চকোলেট দীর্ঘদিন ধরেই মানসিক চাপ কমানোর একটি জনপ্রিয় খাবার হিসেবে পরিচিত। এতে থাকা বিশেষ উপাদান শরীরে ভালো লাগার অনুভূতি তৈরি করে। এটি মস্তিষ্কে সেরোটোনিন নামের রাসায়নিক উৎপাদনে সহায়তা করে, যা মন ভালো রাখতে সাহায্য করে।

বাদাম, বিশেষ করে কাঠবাদাম, আখরোট এবং চিনেবাদাম, মস্তিষ্কের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এতে থাকা ম্যাগনেসিয়াম, প্রোটিন এবং অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বাড়ায় এবং মানসিক চাপ কমাতে সহায়তা করে। নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে বাদাম খেলে মনোযোগ বাড়ে এবং উদ্বেগ কমে।

রসুনও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। রসুন শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকলে মানসিক চাপও অনেকাংশে কম থাকে।

ওটস একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর খাবার, যা মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এতে থাকা আঁশ এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদান মস্তিষ্কে সেরোটোনিন উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করে। এই রাসায়নিক মানুষের মধ্যে ভালো লাগার অনুভূতি সৃষ্টি করে এবং বিষণ্নতা কমাতে সহায়তা করে।

এ ছাড়া স্যালমন মাছ, ডিম, কলা, হলুদ এবং চিয়া সিডের মতো খাবারও মানসিক চাপ কমাতে কার্যকর। এসব খাবারে থাকা বিভিন্ন ভিটামিন, খনিজ এবং অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট মস্তিষ্কের সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু খাবারই নয়, এর সঙ্গে সঠিক জীবনযাপনও গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত ব্যায়াম এবং ইতিবাচক চিন্তাভাবনা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তবে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন মানসিক সুস্থতা বজায় রাখার একটি সহজ এবং কার্যকর উপায়।

বর্তমান সময়ে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বাড়ছে। মানুষ বুঝতে পারছে, শারীরিক স্বাস্থ্যের মতো মানসিক স্বাস্থ্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক খাদ্যাভ্যাস এই ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

চিকিৎসকরা পরামর্শ দেন, প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর খাবার অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এতে শুধু শরীর নয়, মনও সুস্থ থাকবে। ছোট ছোট পরিবর্তন, যেমন প্রতিদিন ফল খাওয়া, বাদাম খাওয়া বা গ্রিন টি পান করা, মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বড় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

জীবনের নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে মানসিক চাপ এড়ানো কঠিন হলেও সঠিক খাদ্যাভ্যাস মানুষের মনকে শক্তিশালী করতে পারে। তাই সুস্থ ও সুখী জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজন শুধু শরীরের যত্ন নয়, মনের যত্নও। আর সেই যত্নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে প্রতিদিনের খাবার।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত