প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
২০০৮ সালে অপ্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে যৌন সম্পর্কের মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়া জেফরি এপস্টেইন পরবর্তীতে বিভিন্ন দেশের ধনী, প্রভাবশালী ও ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইকোনমিস্ট সম্প্রতি প্রকাশিত ১৪ লাখ ইমেইল বিশ্লেষণ করে এপস্টেইনের সঙ্গে কার কার যোগাযোগ সবচেয়ে বেশি ছিল, তার একটি চিত্র তুলে ধরেছে।
ইমেইল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০০৮ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে অন্তত ৫০০ জন ব্যক্তির সঙ্গে এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। কোনো কোনো মাসে তারা একে অপরের সঙ্গে শতাধিক ইমেইল বিনিময় করেছেন। তালিকার শীর্ষে রয়েছেন সাবেক ব্রিটিশ যুবরাজ অ্যান্ড্রু আলবার্টের সহকারী ডেভিড স্টার্ন, যিনি এপস্টেইনের সঙ্গে নিয়মিত ইমেইল লেনদেনের মধ্যে ছিলেন। তারপরে আছেন কানাডীয়-মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী লরেন্স ক্রস, সাংবাদিক মাইকেল উলফ, এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠ বান্ধবী গিলেন ম্যাক্সওয়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ট্রেজারি সেক্রেটারি ল্যারি সামার্স।
তালিকায় আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব রয়েছেন যেমন ফরাসি ব্যাংকার আরিয়ান ডি রথসচাইল্ড, লিংকডইনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা রিড হফম্যান, ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট পিটার থিয়েল, হোয়াইট হাউসের সাবেক স্ট্র্যাটেজিস্ট স্টিভ ব্যানন, মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস এবং টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইলন মাস্ক। এদের সঙ্গে এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠতার মাত্রা বুঝতে খাতভিত্তিক বিশ্লেষণও করা হয়েছে।
আর্থিক খাতে যুক্তরাজ্যের বার্কলেস ব্যাংকের সাবেক সিইও জেস স্ট্যানলির সঙ্গে এপস্টেইনের ৪ হাজার ৫৬৬টি ইমেইল বিনিময় হয়েছে। শিক্ষাখাতে গবেষক বরিস নিকোলিকের সঙ্গে ১৫ হাজার ৫০৩টি ইমেইল পাওয়া গেছে। রাজনীতিবিদদের মধ্যে আছেন যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির সাবেক নেতা পিটার ম্যান্ডেলসন, যাদের সঙ্গে ৪,৫৯৭টি ইমেইল হয়েছে, এবং ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাকের সঙ্গে ৪,২৪৮টি ইমেইল লেনদেন আছে। গণমাধ্যম ও বিনোদন জগতের ব্যক্তিদের মধ্যে আমেরিকান প্রকাশক পেগি সিগালের সঙ্গে ৬,৪৩৭টি, সাংবাদিক মাইকেল উলফের সঙ্গে ৪,৮৩১টি এবং অভিনেতা-পরিচালক উডি অ্যালেনের সঙ্গে ১,০৬৬টি ইমেইল বিনিময় হয়েছে।
এপস্টেইনের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা অধিকাংশ ব্যক্তিই জানিয়েছেন, তারা তাঁর অপরাধের প্রকৃত বিষয়টি জানতেন না। ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শুধু ইমেইল বিনিময়ের সংখ্যা দিয়ে কার ঘনিষ্ঠতার মাত্রা নির্ধারণ করা যায় না। তাই তারা পাল্টাপাল্টি ইমেইলের পরিমাণও পর্যবেক্ষণ করেছে। এতে দেখা গেছে, ফরাসি ব্যাংকার আরিয়ান ডি রথসচাইল্ড নিজ থেকে এপস্টেইনের চেয়ে বেশি ইমেইল পাঠিয়েছেন। কানাডীয়-মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী লরেন্স ক্রসের সঙ্গে মাসিক ইমেইল লেনদেন প্রায় সমান ছিল। অপরদিকে, বিল গেটসকে এপস্টেইন নিজেই সবচেয়ে বেশি ইমেইল করেছেন।
২০১৯ সালে যৌন নিপীড়ন ও নারী পাচারের মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর কারাগারে আত্মহত্যা করেন এপস্টেইন। সম্প্রতি মার্কিন বিচার বিভাগ কয়েক লাখ নথি প্রকাশ করেছে, যেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বিভিন্ন দেশের ধনী ও ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের নাম এসেছে। তবে নথিতে নাম থাকাটাই তাদের অপরাধ প্রমাণ করে না।
তবে প্রকাশিত নথি ইতিমধ্যেই প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। অ্যান্ড্রু আলবার্টের ব্রিটিশ রাজ পরিবারের উপাধি বাতিল করা হয়েছে। লেবার পার্টির নেতা পিটার ম্যান্ডেলসন দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। ম্যান্ডেলসনের বিরুদ্ধে সংবেদনশীল তথ্য পাচারের অভিযোগ আছে, এবং যুক্তরাজ্যের পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের কঠোর সমালোচনা হয়েছে ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে দূত নিয়োগের কারণে।
প্রযুক্তি খাতের ধনকুবের বিল গেটসের সাবেক স্ত্রী মেলিন্ডা ফ্রেঞ্জ গেটস তাদের দাম্পত্য জীবনের যন্ত্রণার কথা উল্লেখ করেছেন। এছাড়া, মার্কিন কংগ্রেসে সাক্ষ্য দিতে রাজি হয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন। অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্প বিষয়টি পেছনে রেখে সামনে এগোনোর কথা জানিয়েছেন।
এপস্টেইনের ইমেইল বিশ্লেষণ প্রমাণ করছে, ধনী ও ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল, তবে এ তথ্য সরাসরি অপরাধের প্রমাণ নয়। তবুও এটি নীতিনিষ্ঠ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রভাবের ওপর প্রশ্ন তোলে। এ ধরনের তথ্য প্রকাশ ভবিষ্যতে সাইবার অনুসন্ধান, বিচার প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক নৈতিক দায়িত্ব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেবে।