প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে আগ্রহ ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে, তার নতুন এক মাত্রা যোগ করেছে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশ কাতারের উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সাফল্যের পর তারেক রহমান-এর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন ড. মোহাম্মদ বিন আব্দুল আজিজ বিন সালেহ আল খোলাইফি, যিনি কাতার-এর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই ফোনালাপকে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রোববার অনুষ্ঠিত এই ফোনালাপের বিষয়টি নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ প্রকাশ করেন কাতারের এই প্রতিমন্ত্রী। সেখানে তিনি জানান, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল সাফল্য অর্জনের জন্য তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি ভবিষ্যতে কাতার ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় ও বহুমাত্রিক করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
নিজের বার্তায় খোলাইফি উল্লেখ করেন, তিনি বিএনপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে কথা বলেছেন এবং দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোকে আরও সম্প্রসারণের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, কাতার বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয় এবং ভবিষ্যতে এই সম্পর্ককে অর্থনীতি, বিনিয়োগ, জ্বালানি, শ্রমবাজার ও উন্নয়ন সহযোগিতার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে।
এই ফোনালাপকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একটি তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচনা করছেন। কারণ, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন বার্তা আসতে শুরু করেছে। এর মাধ্যমে নতুন সরকারকে ঘিরে বৈশ্বিক সমর্থনের একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ শাখার দেওয়া তথ্যমতে, এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল মোট প্রদত্ত ভোটের ৪৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ পেয়েছে। অন্যদিকে জামায়াত পেয়েছে ৩১ দশমিক ৭৬ শতাংশ ভোট। এই ফলাফলের ভিত্তিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২১২টি আসন লাভ করে সরকার গঠনের যোগ্যতা অর্জন করেছে।
নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা গেছে, বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসনে জয়লাভ করেছে, যা দলটির জন্য একটি ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক পর দলটি এমন বিপুল বিজয় অর্জন করায় তাদের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে দলীয় নেতাকর্মীরা আনন্দ মিছিল ও সমাবেশের মাধ্যমে এই বিজয় উদযাপন করেছেন।
নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর দেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস-ও তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এক শুভেচ্ছা বার্তায় তিনি বলেন, জনগণের এই রায় দেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ও সাংবিধানিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে এবং দেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা আরও ত্বরান্বিত হবে।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দীন। এরপর প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ পড়াবেন দেশের রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই শপথ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে এবং দেশি-বিদেশি অতিথিদের উপস্থিতিতে এটি একটি ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে পরিণত হতে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, কাতারের প্রতিমন্ত্রীর এই ফোনালাপ শুধু একটি শুভেচ্ছা বিনিময় নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ভবিষ্যৎ সম্পর্কের সম্ভাবনার একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত। কাতার বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার এবং দেশটির অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের বড় একটি অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, যার মধ্যে কাতারের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
এছাড়া জ্বালানি খাতেও কাতার বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে কাতার দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা করে আসছে। নতুন সরকারের সময় এই সহযোগিতা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন সরকারের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আগ্রহ ও সমর্থন দেশের অর্থনীতি ও কূটনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে। বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এসব যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বর্তমানে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উচ্চপর্যায়ের নেতাদের শুভেচ্ছা বার্তা ও যোগাযোগ নতুন সরকারের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সামনে নতুন সরকারকে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জোরদারের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হবে। কাতারের মতো প্রভাবশালী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন সেই পথকে আরও সুগম করতে পারে।
সব মিলিয়ে, কাতারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর এই ফোনালাপ শুধু একটি আনুষ্ঠানিক অভিনন্দন নয়, বরং এটি বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এই ঘটনাকে ঘিরে ইতিবাচক আলোচনা তৈরি হয়েছে এবং এটি নতুন সরকারের প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থার প্রতিফলন বলেই মনে করা হচ্ছে।