খেলাপি ঋণের বোঝা নিয়ে সংসদে ১১ নতুন এমপি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৩ বার
খেলাপি ঋণের বোঝা নিয়ে সংসদে ১১ নতুন এমপি

প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলেও, সেই অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আর্থিক শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের সুযোগ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়া অন্তত ৪৫ জন ঋণখেলাপি প্রার্থীর মধ্যে ১১ জন বিজয়ী হয়ে সংসদে যাওয়ার পথে রয়েছেন। তাদের সবাই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল থেকে নির্বাচিত। তবে তাদের এই বিজয়ের পেছনে যে আইনি জটিলতা এবং আর্থিক দায় রয়ে গেছে, তা নতুন সংসদের শুরুতেই বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, বিজয়ী এই ১১ জন সংসদ সদস্যের প্রার্থিতা বৈধ হয়েছে মূলত উচ্চ আদালতের দেওয়া স্থগিতাদেশের কারণে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা আরপিও অনুযায়ী, কোনো ঋণখেলাপি ব্যক্তি সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না। কিন্তু আদালতের ‘স্টে অর্ডার’ বা স্থগিতাদেশের কারণে তাদের ঋণখেলাপি হিসেবে দেখানো হয়নি এবং তারা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। এখন প্রশ্ন উঠেছে, আদালতের স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হলে বা মামলার চূড়ান্ত রায় তাদের বিরুদ্ধে গেলে তারা সংসদ সদস্য হিসেবে টিকে থাকতে পারবেন কি না।

এরই মধ্যে চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনে নির্বাচিত দুই প্রার্থীর ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশ স্থগিত রেখেছে। এই দুই আসনের বিজয়ী যথাক্রমে সরোয়ার আলমগীর এবং মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী। তাদের ঋণখেলাপি সংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তি না হওয়ায় তারা এখনো শপথ অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ পাননি। বিষয়টি শুধু তাদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নয়, বরং পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

নির্বাচন কমিশনের কাছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরো (সিআইবি) থেকে পাঠানো তালিকা অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র জমার সময় ৮২ জন প্রার্থীকে ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এর বাইরে আরও ৩১ জন উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে প্রার্থিতা বজায় রাখেন। পরে আপিল এবং আদালতের আদেশের মাধ্যমে মোট ৪৫ জন ঋণখেলাপি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। তাদের মধ্যে ১১ জন বিজয়ী হয়েছেন।

এই বিজয়ীদের মধ্যে রয়েছেন চট্টগ্রাম-৬ আসনের গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, কুমিল্লা-১০ আসনের মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া, কুমিল্লা-৯ আসনের আবুল কালাম, বগুড়া-১ আসনের কাজী রফিকুল ইসলাম, বগুড়া-৫ আসনের গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ, টাঙ্গাইল-৪ আসনের লুৎফর রহমান, ময়মনসিংহ-৫ আসনের মোহাম্মদ জাকির হোসেন, মৌলভীবাজার-৪ আসনের মুজিবুর রহমান চৌধুরী এবং সিলেট-১ আসনের খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর। তাদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই আদালতের স্থগিতাদেশের মাধ্যমে ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার বিষয়টি সাময়িকভাবে স্থগিত রয়েছে।

আইন অনুযায়ী, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরও যদি প্রমাণ হয় যে তিনি ঋণখেলাপি ছিলেন বা হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন, তাহলে নির্বাচন কমিশন তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল করতে পারে। ফলে এই ১১ জন সংসদ সদস্যের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং তাদের ঋণ পরিশোধের ওপর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেছেন, উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচন করা একটি সাময়িক সমাধান মাত্র। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা তাদের ঋণ পরিশোধ বা পুনঃতপশিলের মাধ্যমে নিয়মিত করার উদ্যোগ নেবেন। তার মতে, জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তই প্রার্থিতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত হওয়া উচিত। আদালতের স্থগিতাদেশের মাধ্যমে যেসব প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন, তা নির্বাচনের ফলাফল এবং প্রতিযোগিতার ভারসাম্যে প্রভাব ফেলেছে বলে তিনি মনে করেন।

এছাড়া ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আইনের চোখে সব নাগরিক সমান হলেও বাস্তবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অনেক সময় আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে সুবিধা পান। তিনি বলেন, ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতারা সামান্য ঋণের কারণে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হন, অথচ বড় ঋণখেলাপিরা আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন। এটি আইনের সমতার নীতির পরিপন্থী।

নির্বাচনের আগে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, কোনো ঋণখেলাপিকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরও জানিয়েছিলেন, আদালতের স্থগিতাদেশ থাকলেও ঋণখেলাপিদের সিআইবিতে খেলাপি হিসেবে দেখানো হবে। তবে আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে সেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

এই পরিস্থিতি দেশের আর্থিক খাত এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে একটি জটিল সম্পর্কের চিত্র তুলে ধরে। ব্যাংক থেকে নেওয়া বিপুল পরিমাণ ঋণ পরিশোধ না করেও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করার আগে তাদের আর্থিক দায় নিষ্পত্তি করা উচিত।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি নতুন সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। তারা মনে করেন, সংসদ সদস্যদের আর্থিক দায় নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা গেলে জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পাবে এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাস আরও সুদৃঢ় হবে।

এখন সবার দৃষ্টি আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যদের পদক্ষেপের দিকে। তারা যদি দ্রুত তাদের ঋণ পরিশোধ বা পুনঃতপশিলের মাধ্যমে নিয়মিত করতে পারেন, তাহলে তাদের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনে কোনো বাধা থাকবে না। অন্যথায়, আইনের বিধান অনুযায়ী তাদের সংসদ সদস্য পদ হারানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এই ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এটি শুধু আইনের প্রয়োগ নয়, বরং রাজনৈতিক নৈতিকতা এবং জবাবদিহিতার প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে এসেছে। জনগণের প্রত্যাশা এখন একটাই—যারা দেশের আইন প্রণয়ন করবেন, তারা যেন নিজেরাও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত