প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মানুষ সৌন্দর্য ভালোবাসে। এই ভালোবাসা তার সহজাত প্রবৃত্তি। সুন্দর দৃশ্য, সুন্দর কথা, সুন্দর আচরণ—এসবের প্রতি মানুষের আকর্ষণ চিরন্তন। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে সৌন্দর্য শুধু বাহ্যিক নয়, বরং এর প্রকৃত ভিত্তি মানুষের অন্তরের গভীরে। ইসলাম এমন এক জীবনব্যবস্থা, যা মানুষকে ভেতর ও বাইরের সমন্বিত সৌন্দর্যের দিকে আহ্বান করে। একজন প্রকৃত মুমিনের জীবনে তাই সৌন্দর্য কেবল পোশাক বা চেহারায় সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা তার চরিত্র, আচরণ, চিন্তা ও আত্মার মধ্যেও প্রতিফলিত হয়।
ইসলাম ঘোষণা করেছে, মহান আল্লাহ নিজেই সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্য ভালোবাসেন। এই ঘোষণা এসেছে প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে, যা সংকলিত হয়েছে সহিহ মুসলিম-এ। এই হাদিস শুধু একটি ধর্মীয় বাণী নয়; বরং এটি মানুষের জীবনে সৌন্দর্যের দর্শন প্রতিষ্ঠা করে। এর মাধ্যমে মুমিনের হৃদয়ে এমন একটি উপলব্ধি জন্ম নেয় যে, সৌন্দর্য অর্জন করা মানে আল্লাহর প্রিয় হওয়া।
মহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিজগতকে সৌন্দর্যে ভরিয়ে দিয়েছেন। আকাশের নক্ষত্ররাজি, সবুজ বৃক্ষ, পাহাড়-নদী, ফুলের সুবাস—সবকিছুতেই রয়েছে এক অপূর্ব সুষমা। কোরআন বারবার মানুষকে এই সৌন্দর্যের দিকে দৃষ্টি দিতে আহ্বান করেছে। কারণ এই সৌন্দর্য শুধু দেখার জন্য নয়, বরং মানুষের অন্তরে সৌন্দর্যের চেতনা জাগিয়ে তোলার জন্য। মানুষ যখন এই সৃষ্টির দিকে গভীরভাবে তাকায়, তখন সে উপলব্ধি করতে পারে তার স্রষ্টার মহিমা এবং সৌন্দর্যের প্রতি ভালোবাসা।
মানুষ নিজেও আল্লাহর সবচেয়ে সুন্দর সৃষ্টি। আল্লাহ মানুষকে শুধু শারীরিকভাবে সুন্দর করেননি, বরং তাকে বিবেক, অনুভূতি এবং নৈতিকতার মতো অমূল্য গুণাবলি দিয়েছেন। এই গুণগুলোই মানুষের প্রকৃত সৌন্দর্য। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে বাহ্যিক সৌন্দর্য কখনোই যথেষ্ট নয়, যদি অন্তর কলুষিত থাকে। আবার অন্তর সুন্দর হলেও বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতা ও শালীনতা উপেক্ষা করা ইসলামের শিক্ষা নয়। ইসলাম চায় পূর্ণতা—যেখানে অন্তর ও বাহ্যিক রূপ উভয়ই হবে সুন্দর।
একজন মুমিনের সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায় তার কথাবার্তায়। সুন্দর ভাষা, নম্র আচরণ এবং অন্যের প্রতি সম্মান—এসব একজন মানুষের মর্যাদা বাড়িয়ে দেয়। কোরআনে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মানুষের সঙ্গে উত্তমভাবে কথা বলার জন্য। কারণ কথার মাধ্যমে মানুষ অন্যের হৃদয় জয় করতে পারে, আবার আঘাতও করতে পারে। তাই একজন মুমিন সব সময় তার ভাষার সৌন্দর্য রক্ষা করে।
চরিত্রের সৌন্দর্য মুমিনের সবচেয়ে বড় পরিচয়। একজন মুমিন কখনো প্রতারণা করে না, অন্যের অধিকার নষ্ট করে না এবং নিজের নৈতিকতা বিসর্জন দেয় না। সে জানে, তার প্রতিটি কাজের হিসাব তাকে আল্লাহর কাছে দিতে হবে। তাই সে নিজের দৃষ্টি সংযত রাখে, নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে এবং নিজের চরিত্রকে পবিত্র রাখার চেষ্টা করে। এই আত্মসংযমই তার প্রকৃত সৌন্দর্য।
ধৈর্য মুমিনের জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সৌন্দর্য। জীবনে দুঃখ, কষ্ট, ব্যর্থতা আসবেই। কিন্তু একজন মুমিন ধৈর্যের মাধ্যমে সেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করে। ধৈর্য তাকে শক্তিশালী করে এবং তার অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে। ধৈর্যশীল মানুষ অন্যদের কাছে সম্মানিত হয় এবং আল্লাহর কাছেও প্রিয় হয়ে ওঠে।
ইসলাম বাহ্যিক সৌন্দর্যকেও গুরুত্ব দিয়েছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক, শালীনতা এবং পরিপাটি জীবনযাপন একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য। এখানে বাহ্যিক সৌন্দর্য মানে বিলাসিতা নয়, বরং পরিচ্ছন্নতা ও শালীনতা। একজন মুমিন যখন সুন্দর ও পরিপাটি হয়ে নামাজে দাঁড়ায়, তখন তা শুধু তার বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, বরং তার অন্তরের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রকাশ।
মুমিনের জীবনে সৌন্দর্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থহীন কাজ পরিহার করা। যে কাজ মানুষের কোনো উপকারে আসে না, যা তার সময় নষ্ট করে এবং তাকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়—সেসব কাজ থেকে দূরে থাকা একজন সুন্দর মুমিনের পরিচয়। কারণ সময় মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।
আমানত রক্ষা করা এবং অঙ্গীকার পূরণ করাও মুমিনের সৌন্দর্যের অংশ। একজন মুমিন কখনো বিশ্বাসঘাতকতা করে না। তার ওপর কেউ ভরসা করলে সে সেই ভরসার মর্যাদা রক্ষা করে। এই গুণ তাকে সমাজে সম্মানিত করে এবং তার ব্যক্তিত্বকে উজ্জ্বল করে তোলে।
সুরের সৌন্দর্যও ইসলামে একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। সুন্দর কণ্ঠে কোরআন তিলাওয়াত মানুষের অন্তরকে প্রশান্ত করে এবং তাকে আল্লাহর আরও কাছে নিয়ে যায়। এটি শুধু একটি ইবাদত নয়, বরং একটি সৌন্দর্যের প্রকাশ, যা মানুষের আত্মাকে আলোকিত করে।
এই সব সৌন্দর্যের মূল ভিত্তি হলো আত্মশুদ্ধি। আত্মশুদ্ধি ছাড়া কোনো সৌন্দর্য পূর্ণতা পায় না। যখন মানুষ নিজের অন্তরকে হিংসা, অহংকার এবং লোভ থেকে মুক্ত করে, তখন তার ভেতর থেকে প্রকৃত সৌন্দর্য প্রকাশ পায়। কোরআন ঘোষণা করেছে, সেই সফল, যে নিজের আত্মাকে পবিত্র করেছে এবং সেই ব্যর্থ, যে তাকে কলুষিত করেছে।
আজকের পৃথিবীতে মানুষ বাহ্যিক সৌন্দর্যের পেছনে যতটা সময় ও শ্রম ব্যয় করে, তার সামান্য অংশও যদি অন্তরের সৌন্দর্যের জন্য ব্যয় করত, তাহলে সমাজ অনেক বেশি সুন্দর হতো। কারণ বাহ্যিক সৌন্দর্য সময়ের সঙ্গে ম্লান হয়ে যায়, কিন্তু অন্তরের সৌন্দর্য চিরস্থায়ী।
একজন প্রকৃত মুমিন তাই নিজের ভেতর ও বাইরের সৌন্দর্যের সমন্বয় ঘটায়। তার চেহারায় থাকে নম্রতা, কথায় থাকে মাধুর্য, আচরণে থাকে সততা এবং অন্তরে থাকে আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসা। এই সমন্বিত সৌন্দর্যই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে এবং তাকে আল্লাহর প্রিয় বান্দায় পরিণত করে।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই প্রকৃত সৌন্দর্যের অধিকারী হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।