প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক স্তরে হঠাৎ পরিবর্তন সবসময়ই কৌতূহল, প্রশ্ন এবং আলোচনার জন্ম দেয়। বিশেষ করে যখন সেই পরিবর্তন আসে দায়িত্ব গ্রহণের অল্প সময়ের মধ্যেই, তখন তা প্রশাসনিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করে। এবার এমনই এক ঘটনায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া, যিনি দায়িত্বে বহাল থাকা অবস্থায় হঠাৎ করেই পদত্যাগের আবেদন করেছেন।
সোমবার তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধান উপদেষ্টার কাছে তার পদত্যাগপত্র জমা দেন। পরবর্তীতে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য আবেদনটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়-এ পাঠানো হয়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। পদত্যাগের এই সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে নানা আলোচনা ও বিশ্লেষণের জন্ম দিয়েছে।
বিশেষভাবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, খুব অল্প সময় আগেই তাকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদ মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এর আগে মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন শেখ আব্দুর রশীদ। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করে সরকার। জানা যায়, তিনি নিজেও পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
সেই একই দিনে প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়াকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় এবং তিনি দেশের প্রশাসনিক কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র দুই দিনের মাথায় তার পদত্যাগের আবেদন নতুন করে প্রশাসনিক অঙ্গনে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে।
প্রশাসনিক সূত্রগুলো বলছে, এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া তার পদত্যাগপত্রে ব্যক্তিগত কারণে অবশিষ্ট মেয়াদে দায়িত্ব পালন করতে অপারগতার কথা উল্লেখ করেছেন। যদিও পদত্যাগের পেছনে নির্দিষ্ট কোনো কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, তবে প্রশাসনের ভেতরে বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা চলছে।
উল্লেখ্য, এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া একজন অভিজ্ঞ এবং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা। ২০২৪ সালের ২ অক্টোবর তাকে দুই বছরের চুক্তিতে প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। সেই হিসেবে তার মেয়াদ চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত থাকার কথা ছিল। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় সাত মাস আগেই তিনি দায়িত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
প্রশাসনিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মুখ্য সচিব পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল একটি দায়িত্ব। এই পদে থাকা ব্যক্তি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেন। ফলে এই পদে পরিবর্তন প্রশাসনের সামগ্রিক কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে বর্তমান সময়ে যখন নতুন সরকার গঠন, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস এবং নীতিগত পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সামনে রয়েছে, তখন এই পদত্যাগ প্রশাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রশাসনের অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা মনে করছেন, সরকারের উচ্চপর্যায়ে এই ধরনের পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ হলেও এর পেছনে থাকা কারণ এবং ভবিষ্যৎ প্রভাব নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহ তৈরি হয়। কারণ প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত দেশের প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা এবং নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই পদত্যাগ নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। অনেকেই জানতে চাইছেন, দায়িত্ব গ্রহণের এত অল্প সময়ের মধ্যেই কেন তিনি এই সিদ্ধান্ত নিলেন এবং এর ফলে প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে।
সরকারি সূত্রগুলো বলছে, পদত্যাগপত্রটি এখনো চূড়ান্তভাবে গ্রহণ করা হয়নি। প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানানো হবে। একই সঙ্গে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন কাউকে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
এম সিরাজ উদ্দিন মিয়ার দীর্ঘ প্রশাসনিক জীবনে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তার অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতার কারণে তাকে গুরুত্বপূর্ণ এই পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ফলে তার পদত্যাগ প্রশাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোতে মুখ্য সচিব এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব পদ দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পদগুলোতে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তারা সরকারের নীতিনির্ধারণ এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ফলে এই পদগুলোতে পরিবর্তন প্রশাসনের ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমানে প্রশাসনিক অঙ্গনের দৃষ্টি এখন সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে। পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হবে কি না, নতুন নিয়োগ কবে দেওয়া হবে এবং প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা কীভাবে বজায় রাখা হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে অপেক্ষা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে, প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিবের এই পদত্যাগের আবেদন দেশের প্রশাসনিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি প্রশাসনের সামগ্রিক কাঠামো এবং ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবেই দেখা হচ্ছে।