প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
প্রযুক্তির অগ্রগতির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত থাকে, যা শুধু নতুন একটি ফিচার যুক্ত হওয়ার ঘটনা নয়, বরং মানুষের যোগাযোগের ধরনই বদলে দেয়। স্মার্টফোনের বিবর্তনও ঠিক তেমনই এক ধারাবাহিক যাত্রা। এবার সেই যাত্রায় নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে Apple–এর আইফোনে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সরাসরি ইন্টারনেট ব্যবহারের সম্ভাবনা। প্রযুক্তি বিশ্বে জোর গুঞ্জন উঠেছে, ভবিষ্যতের আইফোনে শুধু জরুরি বার্তা পাঠানো নয়, বরং স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নিয়মিত উচ্চগতির ইন্টারনেট ব্যবহার করা যাবে।
বর্তমানে আইফোন ব্যবহারকারীদের জন্য স্যাটেলাইট সংযোগ সম্পূর্ণ নতুন কোনো বিষয় নয়। iPhone 14 সিরিজ থেকে শুরু করে পরবর্তী মডেলগুলোতে ‘ইমার্জেন্সি এসওএস ভায়া স্যাটেলাইট’ সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। এই সুবিধা মূলত এমন পরিস্থিতির জন্য তৈরি করা হয়েছে, যখন ব্যবহারকারী কোনো দুর্গম স্থানে থাকেন এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক বা ওয়াই–ফাই কোনো কিছুই কাজ করে না। তখন ব্যবহারকারী ফোনটি আকাশের দিকে তাক করে ধরে নির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুসরণ করে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে জরুরি বার্তা পাঠাতে পারেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই সুবিধা ইতোমধ্যে মানুষের জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তবে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে আরেকটি সম্ভাবনা, যা বাস্তবায়িত হলে স্মার্টফোন ব্যবহারের ধারণাই বদলে যেতে পারে। প্রযুক্তি–বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে আসতে যাওয়া iPhone 18 Pro মডেলে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সরাসরি ফাইভজি গতির ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধা যুক্ত হতে পারে। অর্থাৎ ব্যবহারকারী এমন কোনো স্থানে থাকলেও, যেখানে মোবাইল নেটওয়ার্কের কোনো অস্তিত্ব নেই, সেখান থেকেও ইন্টারনেট ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে।
এই সম্ভাবনার সূত্রপাত হয়েছে মূলত প্রযুক্তি বিষয়ক বিভিন্ন ফাঁস হওয়া তথ্য থেকে। চীনের জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উইবোতে প্রযুক্তি টিপস্টার ফিক্সড ফোকাস ডিজিটাল দাবি করেছেন, আইফোনের ভবিষ্যৎ সংস্করণে নতুন প্রজন্মের সি২ মডেম যুক্ত হতে পারে। এই মডেম এনআর এনটিএন বা নিউ রেডিও নন–টেরেস্ট্রিয়াল নেটওয়ার্ক প্রযুক্তি সমর্থন করে। এই প্রযুক্তির বিশেষত্ব হলো, এটি স্মার্টফোনকে সরাসরি স্যাটেলাইটের সঙ্গে সংযুক্ত করতে সক্ষম। ফলে প্রচলিত মোবাইল টাওয়ার ছাড়াই যোগাযোগ এবং ইন্টারনেট সংযোগ সম্ভব হতে পারে।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই প্রযুক্তি বাস্তবায়িত হলে তা শুধু সুবিধাজনকই হবে না, বরং মানবজীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশ্বের অনেক অঞ্চলে এখনো মোবাইল নেটওয়ার্ক পৌঁছায়নি। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, গভীর বনাঞ্চল কিংবা সমুদ্রের মাঝখানে অবস্থানরত মানুষদের জন্য এটি হতে পারে এক বিপ্লব। এমনকি প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়, যখন মোবাইল নেটওয়ার্ক অচল হয়ে পড়ে, তখনও স্যাটেলাইটের মাধ্যমে যোগাযোগ বজায় রাখা সম্ভব হবে।
প্রযুক্তি সাংবাদিক Mark Gurman, যিনি দীর্ঘদিন ধরে অ্যাপলের বিভিন্ন প্রযুক্তিগত তথ্য ফাঁস করে পরিচিতি পেয়েছেন, তিনিও জানিয়েছেন যে অ্যাপল স্যাটেলাইটভিত্তিক ফাইভজি প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। তার মতে, এই প্রযুক্তি চালু হলে আইফোন শুধু জরুরি বার্তা পাঠানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও স্যাটেলাইট সংযোগ ব্যবহার করা যাবে।
তবে প্রযুক্তির এই সম্ভাবনার সঙ্গে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে উচ্চগতির ইন্টারনেট সরবরাহ করা প্রযুক্তিগতভাবে জটিল এবং ব্যয়বহুল। এছাড়া ব্যাটারির ওপর এর প্রভাব, সংযোগের স্থায়িত্ব এবং ব্যবহারকারীর খরচ—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্যাটেলাইট যোগাযোগ সাধারণ মোবাইল নেটওয়ার্কের তুলনায় বেশি শক্তি ব্যবহার করে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সুবিধা চালু হলেও তা শুরুতে সীমিত পরিসরে চালু হতে পারে। অনেক সময় নতুন প্রযুক্তি প্রথমে নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয় এবং পরে ধীরে ধীরে অন্যান্য অঞ্চলে সম্প্রসারিত করা হয়।
অন্যদিকে, প্রযুক্তি বিশ্বে প্রতিযোগিতাও এই উদ্ভাবনের পেছনে বড় একটি কারণ। বিশ্বের বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে স্যাটেলাইটভিত্তিক যোগাযোগ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। ফলে স্মার্টফোন নির্মাতারা ভবিষ্যতের যোগাযোগ প্রযুক্তিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে নতুন নতুন উদ্ভাবনে মনোযোগ দিচ্ছে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অ্যাপল এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই সুবিধা চালুর বিষয়ে কোনো ঘোষণা দেয়নি। ফলে এটি নিশ্চিত কোনো তথ্য নয়, বরং সম্ভাবনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা বলছেন, অ্যাপল সাধারণত নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়ার আগ পর্যন্ত নীরব থাকে। তাই আইফোন ১৮ সিরিজ আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচনের আগ পর্যন্ত বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
তবুও এই গুঞ্জন প্রযুক্তিপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে। কারণ যদি সত্যিই আইফোনে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহার করা সম্ভব হয়, তাহলে তা হবে স্মার্টফোন প্রযুক্তির ইতিহাসে একটি বড় মাইলফলক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের পৃথিবীতে স্যাটেলাইটভিত্তিক যোগাযোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। শুধু স্মার্টফোন নয়, বরং গাড়ি, ড্রোন এবং বিভিন্ন স্মার্ট ডিভাইসেও এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, আইফোনে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহারের বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়, তবে সম্ভাবনাটি বাস্তবায়িত হলে তা মানুষের যোগাযোগের ধরনে বড় পরিবর্তন আনবে। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে বসেই তখন মানুষ সহজেই ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবে—যা আজকের দিনে অনেকের কাছেই স্বপ্নের মতো মনে হলেও, প্রযুক্তির অগ্রগতিতে তা বাস্তব হয়ে উঠতে পারে খুব শিগগিরই।