প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলায় সুদের টাকা লেনদেনের বিরোধের জেরে এক যুবক নিহত হয়েছেন। রোববার রাতে নোয়াগাঁও ইউনিয়নের পরমেশ্বরদী গ্রামের খোলা মাঠে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহত যুবকের নাম নাঈম হোসেন, বয়স ২২ বছর। তিনি ওই গ্রামের মৃত আবদুল হেকিমের ছেলে। সোনারগাঁ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিবুল্লাহ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
নাঈমের বড় ভাই নাছিমুল হোসেন ঘটনার প্রাথমিক বিবরণ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, গত রোববার রাত নয়টার দিকে খালের পাশে খোলা মাঠ থেকে নাঈমের রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত নাঈম এই এলাকার পেশাদার রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন এবং গ্রামের কয়েকজনের কাছে সুদের বিনিময়ে টাকা ধার দিতেন। নিহতের পরিবার এবং স্থানীয়রা জানিয়েছেন, নাঈম শৈশবেই মা-বাবাকে হারিয়েছিলেন এবং বড় ভাই নাছিমুলসহ বাকি ভাইবোনদের সঙ্গে বড় হয়েছেন।
নাছিমুল হোসেন বলেন, “রাত সাড়ে আটটার দিকে আমরা চা খাচ্ছিলাম। তখন নাঈমের ফোনে একটি কল আসে। ফোনে সে কয়েকবার বলেছে, ‘আমার কাছে টাকা নেই।’ কিছুক্ষণ পর দেখি সে সেখানে নেই। বাড়িতে গিয়ে তার ফোনে কল দিলে বন্ধ পেয়েছি। এর পর ৩০ মিনিটের মধ্যে বাইরে হইচই শুনে বের হলে দেখি খালি মাঠে তার রক্তাক্ত দেহ পড়ে আছে।”
পরিবার ও স্থানীয়দের সহায়তায় নাঈমকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। নাছিমুল জানান, রক্তের কারণে নাঈমের চেহারা চেনা যাচ্ছিল না, তাই তিনি জামাকাপড় দেখে ভাইকে চিহ্নিত করেন।
সোনারগাঁ থানার ওসি মো. মহিবুল্লাহ বলেন, নিহত ব্যক্তির শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, নাঈমের পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সুদের লেনদেনে বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। পুলিশের তদন্তে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
স্থানীয়দের মতে, নাঈম ছিলেন কর্মঠ ও সদা হাস্যোজ্জ্বল যুবক। তার শৈশব থেকেই পরিবারের দায়িত্ব সামলেছেন এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনে সহমর্মিতা ও উদার মনোভাব দেখাতেন। এলাকার মানুষজনও নাঈমকে সবার প্রতি সহানুভূতিশীল ও সৎ প্রকৃতির হিসেবে স্মরণ করেছেন। হত্যাকাণ্ডটি এলাকার মানুষকে আতঙ্কিত করেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিত ও পূর্বপরিকল্পিত বলে প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে। ঘটনায় আরও কিছু লোকের যুক্ত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই তদন্ত চলমান রয়েছে এবং হত্যাকারীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে। স্থানীয় প্রশাসন ও থানা পুলিশ এলাকাবাসীর সহায়তায় তদন্ত ত্বরান্বিত করছে।
নিহতের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তারা ন্যায়বিচারের জন্য দ্রুত তদন্ত ও দোষীদের শাস্তি দাবি করছেন। এ ধরনের ঘটনায় স্থানীয় জনগণও দুশ্চিন্তায় রয়েছে। নাঈমের মতো যুবকদের নিরাপত্তা ও আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে এমন ঘটনায় পুনরাবৃত্তি ঘটার আশঙ্কা দেখা দিতে পারে।
সোনারগাঁয়ের এই হত্যাকাণ্ড দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সুদের লেনদেন ও ঋণ সংক্রান্ত সংঘর্ষের সমস্যাকে আবারও সামনে এনেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনৈতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে আইনি সহায়তা, পর্যবেক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি না হলে ভবিষ্যতেও এই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে।
নিহতের পরিবার এবং স্থানীয়রা আশা প্রকাশ করেছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত দোষীদের শনাক্ত ও শাস্তি নিশ্চিত করবে এবং ভবিষ্যতে যুবকদের নিরাপত্তা এবং আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে সুষ্ঠু ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এই হত্যাকাণ্ড পুরো এলাকায় শোক ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এলাকার মানুষ নাঈমকে স্মরণ করে সততা, পরিশ্রম এবং উদার মনোভাবের প্রতীক হিসেবে দেখছেন। তাছাড়া, পুলিশি তৎপরতা এবং দ্রুত গ্রেপ্তারের খবর দিয়েছে যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ঘটনা মোকাবেলায় সচেতন।
সোনারগাঁয়ে এই হত্যাকাণ্ড শুধু একটি স্থানীয় ঘটনা নয়, এটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সুদের লেনদেনে সংঘর্ষ ও অপরাধ বৃদ্ধির ঝুঁকি পুনর্বিবেচনার আহ্বানও প্রদান করেছে। পরিবার, সমাজ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনায় বৃদ্ধি দেখা দিতে পারে।