প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পরমাণু কর্মসূচি ঘিরে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে আজ আন্তর্জাতিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে জেনেভা। এখানে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান-এর মধ্যে দ্বিতীয় দফার উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে অংশ নিতে ইতোমধ্যে জেনেভায় পৌঁছেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। আলোচনার এই ধাপকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে বাড়ছে প্রত্যাশা, একই সঙ্গে রয়েছে সতর্ক দৃষ্টি।
এই বৈঠক এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন পরমাণু সমৃদ্ধকরণ ইস্যু নিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনাপূর্ণ। অতীতে একাধিকবার আলোচনা শুরু হলেও তা স্থায়ী সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে নতুন করে শুরু হওয়া সংলাপকে অনেকেই সম্ভাবনার জানালা হিসেবে দেখছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই আলোচনায় আস্থা ও বাস্তবসম্মত সমঝোতার ভিত্তি তৈরি হয়, তবে তা শুধু দুই দেশের সম্পর্কেই নয়, পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি আলোচনায় সরাসরি উপস্থিত না থাকলেও ‘পরোক্ষভাবে’ যুক্ত থাকবেন এবং আলোচনার অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন। এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, এই আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তার বিশ্বাস, ইরান একটি বাস্তবসম্মত সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী। ট্রাম্পের এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার গতি বাড়াতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা, কারণ এতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আলোচনায় আগ্রহের বার্তা স্পষ্ট হয়েছে।
এর আগে প্রথম দফার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল ওমান-এর মধ্যস্থতায়। সেই বৈঠকে ইরান ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কমানোর বিষয়ে নীতিগত সম্মতি দেয় বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়। যদিও সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সময়সূচি ও শর্ত নিয়ে তখনই মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল। দ্বিতীয় দফার বৈঠকে ইরান ‘ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক’ চুক্তির লক্ষ্যে বাস্তব প্রস্তাব নিয়ে এসেছে বলে জানিয়েছেন আরাগচি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো পক্ষের ওপর একতরফা চাপ সৃষ্টি করে নয়, বরং পারস্পরিক স্বার্থ ও আস্থার ভিত্তিতেই চুক্তি হতে হবে।
আজকের বৈঠকেও মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় থাকছেন ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল-বুসাইদি। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ওমানকে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নিরপেক্ষ অবস্থানই দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হয়েছে। ফলে ওমানের উপস্থিতি আলোচনার সাফল্যের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।
মার্কিন প্রতিনিধিদলে বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা ও সাবেক উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার অংশ নিতে পারেন বলে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। যদিও তাদের অংশগ্রহণ নিয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, তবু সম্ভাব্য উপস্থিতি আলোচনাকে আরও গুরুত্ববহ করে তুলেছে। অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ থাকলেও একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানো সহজ হবে না। তার এই মন্তব্য আলোচনার বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলোর দিকেই ইঙ্গিত করে।
বৈঠকের আগে ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা শিথিল না হলে কোনো ধরনের সমঝোতা সম্ভব নয়। তাদের মতে, চুক্তি হতে হবে ‘দেওয়া-নেয়ার’ ভিত্তিতে এবং শূন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের দাবি তারা মেনে নেবে না। এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, আলোচনায় অংশ নিলেও তেহরান নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ থেকে একচুলও সরে আসতে রাজি নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এই দৃঢ় অবস্থান আলোচনাকে জটিল করে তুললেও একই সঙ্গে বাস্তবসম্মত সমঝোতার সম্ভাবনাও তৈরি করতে পারে, কারণ কঠোর অবস্থানই অনেক সময় কার্যকর সমাধানের পথ তৈরি করে।
বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এই বৈঠকের গুরুত্ব বহুমাত্রিক। পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের দ্বন্দ্ব শুধু দুই দেশের মধ্যকার সমস্যা নয়; এটি জড়িত রয়েছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সামরিক ভারসাম্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর সঙ্গে। ফলে জেনেভার এই আলোচনার ফলাফল বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তা কাঠামোতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে অবিশ্বাস ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সেই বাস্তবতায় সরাসরি সংলাপের প্রতিটি ধাপই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হয়। তারা বলছেন, এই বৈঠক যদি অন্তত আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে পারে, তবে ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত চুক্তির পথ খুলে যেতে পারে। একই সঙ্গে এটি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করবে।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপ ইরানের সাধারণ জনগণের জীবনে প্রভাব ফেলেছে। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা উদ্বেগও রয়েছে। তাই একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমঝোতা উভয় পক্ষের জন্যই লাভজনক হতে পারে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিশ্লেষকদের মতে, যদি আলোচনার মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয়, তবে তা ইরানের সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সহায়ক হবে।
সব মিলিয়ে জেনেভার এই বৈঠককে অনেকেই দেখছেন একটি সম্ভাব্য মোড় ঘোরানো মুহূর্ত হিসেবে। যদিও কূটনৈতিক আলোচনার পথ কখনোই সহজ নয় এবং তাৎক্ষণিক ফল পাওয়ার সম্ভাবনাও কম, তবু এই সংলাপ ভবিষ্যৎ সমাধানের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। এখন বিশ্ববাসীর দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে এই আলোচনার ফলাফলের দিকে—কূটনৈতিক সংলাপ কি দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব কমিয়ে আনতে পারবে, নাকি মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।