ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্সে বিতর্কে উত্তপ্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৪ বার
ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্সে বিতর্কে উত্তপ্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক

প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক–এ প্রস্তাবিত ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স ঘিরে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের একাংশ সরাসরি সংবাদ সম্মেলন করে গভর্নরের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তোলায় প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে উত্তেজনা ও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বিকাশ–কে তড়িঘড়ি করে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে—এমন অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।

সোমবার সকালে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের ব্যানারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কর্মকর্তারা দাবি করেন, ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা হয়নি। তাদের অভিযোগ, একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে দ্রুত পর্ষদ সভা ডাকা হয়েছে। তারা বলেন, এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণত দীর্ঘ মূল্যায়ন, নীতিগত আলোচনা ও পর্যালোচনার প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে না বলে তাদের আশঙ্কা।

সংবাদ সম্মেলনে কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা শ্রাবণ লিখিত বক্তব্যে বলেন, ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার জন্য ডাকা পর্ষদ সভা অবিলম্বে স্থগিত করা প্রয়োজন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে এবং গভর্নরের উপদেষ্টা নিয়োগেও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, একটি স্বাধীন ও পেশাদার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য এসব বিষয় অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

তবে এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো নেওয়া হয়নি। বরং পরিচালনা পর্ষদের সভায় লাইসেন্স দেওয়ার মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ নীতিগত দিকনির্দেশনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তার ভাষায়, “ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার আগে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কোনো তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রশ্নই আসে না।”

গভর্নর আরও অভিযোগ করেন, একটি পক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, নির্বাচনের পর একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করার জন্য এ ধরনের অভিযোগ আনা হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, প্রতিষ্ঠানের চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে সংবাদ সম্মেলন করায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খানও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়টি যাতে কোনোভাবে বিতর্কিত না হয়, সে জন্য শুরু থেকেই একাধিক মূল্যায়ন কমিটি কাজ করছে। তিনি জানান, লাইসেন্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত নয়, বরং মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

তবে কর্মকর্তাদের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে গভর্নরের পূর্ববর্তী পেশাগত সংশ্লিষ্টতা। তারা উল্লেখ করেন, বর্তমান গভর্নর অতীতে ব্র্যাক ব্যাংক–এর চেয়ারম্যান ছিলেন, যেখানে বিকাশের বড় অংশের মালিকানা রয়েছে। এই সম্পর্কের কারণে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে বলে তারা মনে করছেন।

কাউন্সিলের সভাপতি এ কে এম মাসুম বিল্লাহ বলেন, তাদের উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তিকে অপসারণ করা নয়, বরং প্রতিষ্ঠানটির পেশাদারিত্ব ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি। এখানে যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর এর প্রভাব পড়বে।

এই ঘটনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এসেছে, তা হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতি ও স্বাধীনতা। কর্মকর্তারা দাবি করছেন, তারা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ ও আমানতকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব থেকেই এই পদক্ষেপ নিয়েছেন। তারা মনে করেন, একটি স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক মানে এই নয় যে প্রতিষ্ঠানটির প্রধানের সিদ্ধান্ত প্রশ্নাতীত থাকবে। বরং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই একটি সুস্থ প্রতিষ্ঠানের বৈশিষ্ট্য।

অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র বলছে, চাকরিবিধি অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তা সংবাদ সম্মেলন বা জনসমক্ষে বক্তব্য দেওয়ার আগে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে বাধ্য। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সেই নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি। ফলে এটি একটি গুরুতর শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

ডিজিটাল ব্যাংক ধারণাটি বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে নতুন। প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রাহকরা শাখায় না গিয়ে পুরোপুরি অনলাইনে ব্যাংকিং সেবা নিতে পারবেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এটি দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না হলে এটি আর্থিক খাতের জন্য ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।

ব্যাংক খাত বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং এটি দেশের আর্থিক ব্যবস্থার ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বিতর্ক বা পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ওঠা পুরো প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অভ্যন্তরীণ আস্থা পুনর্গঠন করা এবং লাইসেন্স দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে এই বিতর্ক দ্রুত সমাধান না হলে এটি দেশের আর্থিক খাতের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এখন সবার দৃষ্টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের এই পরিস্থিতিতে শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নয়, বরং দেশের পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হয়ে উঠবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত