প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের অনিয়ম, অস্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির অভাব দূর করতে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন আনল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নতুন জারি করা নীতিমালার মাধ্যমে বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা এবং কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সব ধরনের আর্থিক লেনদেন ক্যাশলেস বা নগদবিহীন পদ্ধতিতে পরিচালনা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে টিউশন ফি, ভর্তি ফি, সেশন চার্জসহ সব ধরনের অর্থ শুধুমাত্র ব্যাংক বা নির্ধারিত অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে আদায় করা যাবে।
‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি-সংক্রান্ত নীতিমালা, ২০২৬’ শিরোনামের এই প্রজ্ঞাপন গত ৯ ফেব্রুয়ারি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব রেহেনা পারভীনের সইয়ের মাধ্যমে অনুমোদিত হলেও সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। নীতিমালাটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই শিক্ষা খাতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং শিক্ষা খাতে আর্থিক সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
এই নীতিমালার মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আয়-ব্যয়ের পুরো প্রক্রিয়াকে একটি স্বচ্ছ ও নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে আনা। দীর্ঘদিন ধরে অভিভাবকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, হিসাব গোপন রাখা কিংবা নগদ লেনদেনের মাধ্যমে অনিয়মের অভিযোগ ছিল। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকরা নির্ধারিত ফি ছাড়াও বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য হয়েছেন, কিন্তু তার সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি। নতুন নীতিমালার মাধ্যমে এসব অনিয়ম বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব ধরনের আয় তপশিলি ব্যাংকের মাধ্যমে অথবা সরকারের নির্ধারিত সোনালি পেমেন্ট গেটওয়ে ব্যবহার করে গ্রহণ করতে হবে। অনলাইন বা ব্যাংকিং পদ্ধতি চালু হওয়ার পর কোনো অবস্থাতেই নগদ অর্থ গ্রহণ করা যাবে না। অর্থ আদায়ের পর দুই কার্যদিবসের মধ্যে তা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক লেনদেন একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে থাকবে এবং তা সহজেই যাচাই করা সম্ভব হবে।
শুধু তাই নয়, মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো নতুন খাতে অর্থ আদায় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো প্রতিষ্ঠান নিজেদের ইচ্ছামতো নতুন কোনো ফি বা চার্জ আরোপ করতে পারবে না। এতে অভিভাবকদের ওপর অযৌক্তিক আর্থিক চাপ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই নীতিমালায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান এবং পরিচালনা কমিটির সভাপতির ওপর যৌথভাবে দায়বদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। কোনো ধরনের অনিয়ম বা নীতিমালা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এমপিও সুবিধা স্থগিত বা বাতিল করা এবং পরিচালনা কমিটি ভেঙে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই কঠোর বিধান প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় দায়িত্বশীলতা বাড়াবে।
তবে এই নীতিমালার একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক দিকও রয়েছে। শিক্ষক ও কর্মচারীদের জরুরি আর্থিক প্রয়োজন বিবেচনায় বিশেষ সহায়তার সুযোগ রাখা হয়েছে। চিকিৎসা, দুর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে তারা পরিচালনা কমিটির অনুমোদনক্রমে সর্বোচ্চ ছয় মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ অগ্রিম বা ঋণ হিসেবে নিতে পারবেন। পরে এই অর্থ কিস্তির মাধ্যমে সমন্বয় করা হবে। এর ফলে জরুরি সময়ে শিক্ষক-কর্মচারীরা আর্থিক নিরাপত্তা পাবেন।
শিক্ষা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই নীতিমালা শিক্ষা খাতে ডিজিটাল রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্বজুড়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক ব্যবস্থাপনা চালু হয়েছে, যা স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়িয়েছে। বাংলাদেশেও একই পথে এগোনোর একটি সুস্পষ্ট পদক্ষেপ হিসেবে এই সিদ্ধান্তকে দেখা হচ্ছে।
অভিভাবকদের একটি বড় অংশ এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নগদ লেনদেনের কারণে নানা ধরনের অনিয়ম হয়েছে। এখন ব্যাংকিং পদ্ধতিতে লেনদেন হলে প্রতিটি টাকার হিসাব থাকবে এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ কমে যাবে।
অন্যদিকে কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ মনে করছেন, নতুন এই পদ্ধতি বাস্তবায়নে শুরুতে কিছু চ্যালেঞ্জ আসতে পারে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করতে সময় লাগতে পারে। তবে তারা এটাও স্বীকার করছেন, দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে প্রমাণিত হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নীতিমালার সফল বাস্তবায়নের জন্য শুধু নিয়ম জারি করাই যথেষ্ট নয়, বরং নিয়মিত তদারকি এবং মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তাও নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই নীতিমালার মাধ্যমে শিক্ষা খাতে আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। তারা আশা করছেন, এর ফলে অভিভাবকদের আস্থা বাড়বে এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য এই নীতিমালা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি শুধু আর্থিক অনিয়ম কমাবে না, বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় একটি নতুন মানদণ্ড তৈরি করবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই উদ্যোগ শিক্ষা খাতের সামগ্রিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।