প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আফ্রিকার যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ সুদান আবারও রক্তাক্ত সহিংসতার সাক্ষী হলো। দেশটির করদোফান অঞ্চলের একটি ব্যস্ত বাজারে ভয়াবহ ড্রোন হামলায় অন্তত ২৮ জন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় মানবাধিকার পর্যবেক্ষণকারী সংগঠন ইমার্জেন্সি লইয়ার্স সোমবার এ তথ্য প্রকাশ করে জানায়, হামলার সময় বাজারে প্রচুর সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন, ফলে হতাহতের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যায় এবং পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, হামলাটি ঘটে উত্তর করদোফান প্রদেশের সুদ্রি এলাকায়, যেখানে সপ্তাহের শেষ দিন হওয়ায় বাজারে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ভিড় ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হঠাৎ আকাশে গুঞ্জন শব্দ শোনা যায় এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই বিস্ফোরণের শব্দে চারদিক কেঁপে ওঠে। মুহূর্তেই বাজার এলাকা ধোঁয়া ও ধ্বংসস্তূপে ঢেকে যায়। আহতদের অনেককে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হলেও গুরুতর আহতদের অন্য শহরে স্থানান্তর করতে হয়েছে। মানবাধিকারকর্মীরা আশঙ্কা করছেন, আহতদের মধ্যে অনেকে সংকটাপন্ন অবস্থায় থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, জনবসতিপূর্ণ এলাকায় বারবার ড্রোন ব্যবহার বেসামরিক জীবনের প্রতি চরম অবহেলার পরিচয় দেয় এবং এটি পুরো অঞ্চলের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার জন্য ভয়াবহ হুমকি। তারা উভয় পক্ষকে অবিলম্বে ড্রোন হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে সংগঠনটি দাবি করেছে, হামলাটি সরকারি বাহিনীর ড্রোন থেকে চালানো হয়েছে বলে তাদের কাছে প্রমাণ রয়েছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সামরিক কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সেনাবাহিনী কখনো বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালায় না এবং এই ঘটনায় তাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সত্য নয়।
এই ঘটনার মাত্র এক সপ্তাহ আগে রাহাদ শহরের কাছে আরেকটি ড্রোন হামলায় বাস্তুচ্যুত পরিবার বহনকারী একটি গাড়ি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। সেই হামলায় অন্তত ২৪ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে আটজন শিশু ছিল। স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ড্রোন হামলার সংখ্যা বেড়েছে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এর আগের দিন আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি–এর ত্রাণবাহী বহরেও হামলার ঘটনা ঘটে, যা আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
সুদানে চলমান সংঘাতের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস–এর মধ্যে ক্ষমতার লড়াই। ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে এই দুই শক্তির মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তা পূর্ণমাত্রার গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। সংঘাতের শুরুতে রাজধানীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে তীব্র লড়াই হয়, পরে তা ছড়িয়ে পড়ে প্রদেশগুলোতে। বর্তমানে করদোফান অঞ্চলকে সংঘর্ষের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যেখানে উভয় পক্ষই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছে।
স্বাস্থ্য পরিস্থিতিও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, চলমান সংঘাতে এখন পর্যন্ত অন্তত ৪০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তবে চলমান লড়াই, দুর্গম এলাকা ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মানবিক সংস্থাগুলো বলছে, দেশটির বহু অঞ্চলে খাদ্য, পানি ও চিকিৎসাসেবার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে এবং লাখো মানুষ দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে রয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর জানিয়েছে, করদোফান অঞ্চল বর্তমানে অস্থিরতা ও সহিংসতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সংস্থাটির ভাষ্যমতে, উভয় পক্ষের বিরুদ্ধে বেসামরিক জনগণের ওপর হামলা, নির্বিচার হত্যাকাণ্ড এবং লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বারবার যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানালেও তা কার্যকর হয়নি। বরং সংঘাতের মাত্রা ও বিস্তার দিন দিন বাড়ছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘ জানিয়েছে, গত বছরের অক্টোবরের শেষদিকে দারফুর অঞ্চলে মাত্র তিন দিনে ৬ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যা যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সুদানের সংঘাত এখন শুধু অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠছে। দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা একত্রে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। প্রতিবেশী দেশগুলোতেও এর প্রভাব পড়ছে, কারণ শরণার্থী প্রবাহ ইতোমধ্যে সীমান্ত অতিক্রম করে অন্য দেশে পৌঁছাতে শুরু করেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, যদি দ্রুত আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা না হয়, তাহলে এই সংকট আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিদিনের জীবন এখন আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। বাজার, স্কুল বা রাস্তা—কোনো জায়গাই নিরাপদ নয়। অনেক পরিবার ইতোমধ্যে গ্রাম ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে অন্যত্র চলে গেছে। যারা যেতে পারেনি, তারা প্রতিদিন বিস্ফোরণের শব্দ শুনে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের মানসিক অবস্থার ওপর এর গুরুতর প্রভাব পড়ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, ড্রোন হামলার মতো প্রযুক্তিনির্ভর অস্ত্র ব্যবহারের ফলে যুদ্ধের ধরন বদলে গেছে। আগে যেখানে সংঘর্ষের সময় মানুষ আশ্রয় নিতে পারত, এখন আকাশপথে হামলার কারণে নিরাপদ জায়গা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এ ধরনের হামলা শুধু প্রাণহানি নয়, দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকেও ধ্বংস করে দেয়। বাজার ধ্বংস হওয়া মানে স্থানীয় অর্থনীতি ভেঙে পড়া, যা সাধারণ মানুষের জীবিকাকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করে।
আন্তর্জাতিক মহল মনে করছে, সুদানের চলমান সংকট এখন একটি মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে। খাদ্য সংকট, স্বাস্থ্যঝুঁকি, বাস্তুচ্যুতি এবং সহিংসতা—সব মিলিয়ে দেশটির পরিস্থিতি ভয়াবহ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত না করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। একই সঙ্গে তারা বেসামরিক জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহিমূলক তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন।
সাম্প্রতিক বাজার হামলা সেই আশঙ্কাকেই আরও জোরালো করেছে। একটি সাধারণ দিনের মতোই মানুষ বাজারে গিয়েছিল, কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তাদের জীবনে নেমে আসে মৃত্যুর ছায়া। নিহতদের অনেকেই ছিলেন শ্রমজীবী মানুষ, যারা পরিবারের জন্য খাদ্য সংগ্রহ করতে এসেছিলেন। এই ঘটনা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি অসংখ্য পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের করুণ গল্প। সুদানের আকাশে এখনো যুদ্ধবিমানের গর্জন শোনা যাচ্ছে, আর মাটিতে পড়ে আছে অসংখ্য মানুষের ভাঙা জীবন।
বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এই ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তারা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অনেকেই মনে করেন, সুদানের সংকট সমাধানে কূটনৈতিক চাপ ও সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া স্থায়ী শান্তি সম্ভব নয়। আপাতত দেশটির জনগণ অপেক্ষা করছে এমন এক দিনের জন্য, যেদিন আকাশে ড্রোনের শব্দ নয়, বরং শান্তির বার্তা ভেসে আসবে।