প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ দুই দশক পর সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। দলটির প্রধান তারেক রহমান–এর নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্য ও সংসদ সদস্যরা আজ শপথ নিচ্ছেন। নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের এই মুহূর্তে স্বাভাবিকভাবেই জনমনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা কী পরিমাণ বেতন-ভাতা পান এবং তাঁদের পেছনে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে কত ধরনের ব্যয় করা হয়।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে আইন প্রণয়ন, রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণ এবং জনগণের প্রতিনিধিত্ব করা। এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের জন্য তাঁদের বেতন, ভাতা এবং বিভিন্ন সুবিধা নির্ধারণ করা হয়েছে একটি নির্দিষ্ট আইনের মাধ্যমে। ‘দ্য মিনিস্টার্স, মিনিস্টার্স অব স্টেট অ্যান্ড ডেপুটি মিনিস্টার্স (রিমুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজ) অ্যাক্ট’ অনুযায়ী মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী এবং সংসদ সদস্যদের আর্থিক সুবিধা নির্ধারিত হয়। ১৯৭৩ সালের ৪ এপ্রিল তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী–এর আদেশে এ অধ্যাদেশ জারি করা হয় এবং সর্বশেষ ২০১৬ সালে এতে সংশোধন আনা হয়।
বর্তমান কাঠামো অনুযায়ী একজন মন্ত্রী মাসে ১ লাখ ৫ হাজার টাকা বেতন পান। প্রতিমন্ত্রী পান ৯২ হাজার টাকা এবং উপমন্ত্রী পান ৮৬ হাজার ৫০০ টাকা। অন্যদিকে একজন সংসদ সদস্যের মাসিক বেতন ৫৫ হাজার টাকা। তবে এই বেতনের বাইরে তাঁদের জন্য রয়েছে আরও নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা, যা তাঁদের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করার জন্য দেওয়া হয়।
মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের বিদেশ সফরের বিষয়টিও রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সরকারি কাজে বিদেশ ভ্রমণের সময় তাঁদের দৈনিক ৫০০ থেকে ৭০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত ভাতা দেওয়া হয়। এই ভাতা তাঁদের থাকা, খাওয়া এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় মেটাতে ব্যবহৃত হয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এই সুবিধা তাঁদের কার্যক্রমকে সহজ করে তোলে।
যাতায়াত সুবিধার ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীরা সরকারি খরচে একটি করে গাড়ি ব্যবহার করতে পারেন। এই গাড়ির জ্বালানি বাবদ তাঁরা দৈনিক ১৮ লিটার তেলের সমপরিমাণ অর্থ পান। পাশাপাশি তাঁরা মাসে ৭০ হাজার টাকা পরিবহন ভাতা পান এবং নির্বাচনী এলাকায় যাতায়াতের জন্য আলাদাভাবে মাসে ১২ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়া হয়। সংসদ সদস্যরা শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুযোগ পান, যা তাঁদের অন্যতম বড় সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হয়।
বাসস্থান সুবিধাও রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং উপমন্ত্রীরা সরকারি বাসভবনে থাকার সুযোগ পান। এই বাসভবনের বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি এবং টেলিফোন বিল সরকার বহন করে। কেউ যদি সরকারি বাসভবনে থাকতে না চান, তাহলে মন্ত্রীকে মাসে ৮০ হাজার টাকা এবং প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীকে ৭০ হাজার টাকা করে বাড়িভাড়া দেওয়া হয়। সরকারি বাসভবনের সাজসজ্জার জন্য মন্ত্রীদের বছরে ৫ লাখ টাকা এবং প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীরা বছরে ৪ লাখ টাকা পান।
এছাড়া রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ব্যক্তিগত ভাতা। একজন মন্ত্রী এবং সংসদ সদস্য মাসে ৫ হাজার টাকা সম্মানী ভাতা পান। টেলিফোন ভাতা হিসেবে মাসে দেওয়া হয় ৭ হাজার ৮০০ টাকা, লন্ড্রি ভাতা ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং ক্রোকারিজ ও টয়লেট্রিজ কেনার জন্য দেওয়া হয় মাসে ৬ হাজার টাকা।
সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকায় অফিস পরিচালনার জন্যও নির্দিষ্ট ভাতা রয়েছে। তাঁরা প্রতি মাসে ১৫ হাজার টাকা অফিস খরচ পান, যা তাঁদের নির্বাচনী এলাকার জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজ পরিচালনায় সহায়তা করে।
আপ্যায়ন খরচের জন্যও রয়েছে আলাদা ভাতা। একজন মন্ত্রী মাসে ১০ হাজার টাকা আপ্যায়ন ভাতা পান। প্রতিমন্ত্রী পান ৭ হাজার ৫০০ টাকা এবং উপমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা পান ৫ হাজার টাকা করে। এই ভাতা তাঁদের সরকারি এবং সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ব্যয় করার জন্য দেওয়া হয়।
এছাড়া দাতব্য কাজের জন্য মন্ত্রীদের বছরে ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয়। প্রতিমন্ত্রী পান সাড়ে ৭ লাখ টাকা এবং উপমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা পান ৫ লাখ টাকা করে। এই অর্থ দিয়ে তাঁরা তাঁদের নির্বাচনী এলাকায় মসজিদ, মন্দির, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে সহায়তা করতে পারেন। এর পাশাপাশি রয়েছে বছরে ৫ লাখ টাকার স্বেচ্ছাধীন তহবিল, যা বিভিন্ন জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায়।
মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের চিকিৎসা ব্যয়ও সরকার বহন করে থাকে। অসুস্থ হলে তাঁদের চিকিৎসার সম্পূর্ণ খরচ রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে দেওয়া হয়। এর ফলে তাঁরা নির্ভার মনে তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
তবে এই সুবিধাগুলো নিয়ে বিভিন্ন সময় জনমনে আলোচনা এবং সমালোচনাও দেখা যায়। বিশেষ করে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে তুলনা করে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, এই ব্যয় কতটা যৌক্তিক।
এই প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ–এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের মন্ত্রীরা সাইকেল চালিয়ে অফিসে যান, যা তাঁদের দায়িত্ববোধ এবং সরল জীবনযাত্রার উদাহরণ।
তিনি আরও বলেন, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানো প্রয়োজন। বিশেষ করে নতুন সরকারের উচিত জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী দায়িত্বশীলভাবে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করা।
সব মিলিয়ে বলা যায়, মন্ত্রী এবং সংসদ সদস্যদের জন্য নির্ধারিত বেতন-ভাতা এবং সুযোগ-সুবিধা তাঁদের দায়িত্ব পালনের জন্য একটি কাঠামোগত ব্যবস্থা। তবে এই ব্যয় কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং এর মাধ্যমে জনগণ কতটা উপকৃত হচ্ছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে জনগণের প্রত্যাশা আরও বেড়ে গেছে। জনগণ আশা করছে, রাষ্ট্রীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে নতুন সরকার একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং দায়িত্বশীল প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করবে। কারণ রাষ্ট্রের প্রতিটি টাকাই জনগণের, আর সেই টাকার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করাই একজন জনপ্রতিনিধির সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।