প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সোমবার হরমুজ প্রণালীতে ব্যাপক সামরিক মহড়া শুরু করেছে। পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরকে সংযুক্ত করা এই প্রণালীটি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথগুলোর মধ্যে অন্যতম। সামরিক মহড়া ‘স্ট্রেটেজিক কন্ট্রোল অফ দ্য হরমুজ স্ট্রেইট’ নামে পরিচিত এবং এতে আইআরজিসির নৌবাহিনীসহ বিভিন্ন বিশেষ টিম অংশগ্রহণ করছে। মহড়ার মূল উদ্দেশ্য হলো সামরিক প্রস্তুতি যাচাই, নিরাপত্তা পরিকল্পনা পর্যালোচনা এবং সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলার জন্য সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
আইআরজিসির প্রধান কর্মকর্তা মহানীয়ার জেনারেল মোহাম্মদ পাকপৌরের তত্ত্বাবধানে এই মহড়া পরিচালিত হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মহড়ার সময় বিভিন্ন যুদ্ধকৌশল, নৌযান নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা অনুশীলন করা হচ্ছে। মহড়াটি এমন এক সময়ে শুরু হয়েছে, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে জেনেভায় দ্বিতীয় দফার পরোক্ষ পরমাণু আলোচনা শুরু হতে চলেছে। আলোচনায় দুই দেশের প্রতিনিধি দল ওমানের মধ্যস্থতায় অংশ নিচ্ছে, যেখানে ইরান তার সক্ষমতা এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুনভাবে আলোচনার জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
হরমুজ প্রণালী আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ। এখানে বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ ট্রানজিট হয়, যার কারণে সামরিক মহড়া বা উত্তেজনা শুধুমাত্র আঞ্চলিক নয়, বরং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বাজারেও প্রভাব ফেলে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামরিক মহড়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমান্তরাল নৌপদার্থ স্থাপন অঞ্চলে শক্তি ভারসাম্যের নতুন সংকেত দিচ্ছে।
আইআরজিসি এই মহড়ার মাধ্যমে স্বচ্ছন্দভাবে নৌ-অপারেশন চালাতে সক্ষমতা যাচাই করছে। এটি মূলত নিরাপত্তা পরিকল্পনা, দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা, নৌযান নিয়ন্ত্রণ এবং সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক হুমকির মোকাবেলায় আইআরজিসির সক্ষমতা বৃদ্ধি করার জন্য পরিকল্পিত। মহড়ার সময় নৌবাহিনীর জাহাজগুলো বিভিন্ন কৌশলগত অবস্থানে স্থাপন করা হয়েছে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরীক্ষা চলছে।
ইরানের এই সামরিক মহড়া আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত বহন করছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালীতে যে কোনো সামরিক উত্তেজনা বিশ্ববাজারে তেলের দাম ও সরবরাহে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। এমন অবস্থায়, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও অন্যান্য গলফ রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সমন্বয়ও তীব্র মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
মহড়ার পাশাপাশি, ইরান তার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও আলোচনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবেলা করার চেষ্টা করছে। ইরানের কর্মকর্তারা আশা করছেন, শক্তিশালী সামরিক প্রস্তুতি দেখানো এবং সুষ্ঠু কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করে তারা আলোচনায় সমাধান খুঁজে পেতে সক্ষম হবে। তবে, বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন যে, এমন সামরিক মহড়া যেকোনো ভুল বোঝাবুঝি বা দুর্ঘটনার সম্ভাবনাও বাড়িয়ে দিতে পারে, যা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
ইরানের সামরিক মহড়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও তৎপর নজর রাখছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালীতে সামরিক মহড়ার ফলে কেবল সামরিক শক্তি প্রদর্শনই নয়, বরং কূটনৈতিক বার্তা পাঠানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে তার প্রভাবও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। এই মহড়া বিশ্বের শক্তি ভারসাম্যের দিক থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে ধরা হচ্ছে।
ইরানের সামরিক মহড়া এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিস্থিতি বিশেষ করে জ্বালানি বাজারের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তা বজায় রাখা বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে, কারণ এই প্রণালী বিশ্ববাজারে তেলের স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মহড়ার মাধ্যমে ইরান একটি শক্তিশালী এবং আত্মনির্ভরশীল সামরিক অবস্থান দেখানোর চেষ্টা করছে, যা আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর কূটনৈতিক সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলবে।
সামরিক মহড়ার পাশাপাশি, হরমুজ প্রণালীতে পর্যবেক্ষণ এবং সমন্বয় বাড়ানো হয়েছে। আইআরজিসি নৌবাহিনী বিভিন্ন নৌযান এবং আকাশসীমার পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে এই মহড়া চালাচ্ছে। নিরাপত্তা পরিকল্পনা ও প্রতিক্রিয়া কৌশল পরীক্ষা করার পাশাপাশি সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
উল্লেখযোগ্য যে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার ফলে হরমুজ প্রণালী ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে উত্তেজনা ও অস্থিরতা বৃদ্ধি পেতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই মহড়া একটি দ্বিগুণ বার্তা প্রদান করছে — একদিকে সামরিক শক্তির প্রদর্শন, অন্যদিকে কূটনৈতিক আলোচনার প্রয়োজনীয়তা। এমন পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর আকর্ষণ করছে এবং বিশ্ব অর্থনীতির ওপর তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে।
এই মহড়া, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের সামরিক ও কূটনৈতিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা বৃদ্ধি, সামরিক মহড়া এবং আন্তর্জাতিক আলোচনার সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এটি কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।