প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের সাংবাদিকতাকে কেন্দ্র করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। গত দুই মাস ধরে কারাগারে অবস্থান করছেন ঢাকা শহরের জনপ্রিয় সাংবাদিক আনিস আলমগীর। ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর ধানমন্ডির একটি জিম থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর বিভিন্ন মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় এবং রিমান্ডে নেওয়া হয়। এই ঘটনায় সাংবাদিক এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা উল্লেখ করেছেন, সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ ছাড়া সাংবাদিককে দীর্ঘ সময় ধরে কারাগারে রাখা এবং মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো একধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি করছে।
আনিস আলমগীরকে গ্রেপ্তার করার পরও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কারাগারে থাকা অবস্থায় আদালতে শুনানি চলাকালে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ ও কান্নাও করেছেন। ঘটনার পর থেকে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, সরকারের সমালোচনায় যুক্ত হওয়ার কারণে কি সাংবাদিককে এই পরিস্থিতিতে রাখতে হয়েছে।
গ্রেপ্তারের দিন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সেই দিন রাতেই উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়। অভিযোগে বলা হয়, আনিস আলমগীরসহ আরও চারজন ব্যক্তি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং টেলিভিশন টকশোতে সরকারি বিরোধী প্রচারণা চালিয়ে আসছেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, তারা নিষিদ্ধ সংগঠনকে পুনরায় ক্ষমতায় আনার প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন।
এরপর ডিবি পুলিশ তাঁকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার দেখিয়ে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে। পরদিন আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে এবং এরপর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। ২০ ডিসেম্বর রিমান্ড শেষে আনিস আলমগীরকে কারাগারে পাঠানো হয়।
কারাগারে থাকার মধ্যেই ২০২৬ সালের ১৫ জানুয়ারি দুদক তাঁর বিরুদ্ধে আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও মানি লন্ডারিং সংক্রান্ত মামলা দায়ের করে। মামলায় বলা হয়েছে, তাঁর বৈধ আয়ের বাইরে ৩ কোটি ২৬ লাখ ৪৮ হাজার ৯৩৮ টাকার সম্পদ আছে, যা মোট অর্জিত সম্পদের প্রায় ৭৭ শতাংশ। এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেন। ২৮ জানুয়ারি ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. সাব্বির ফয়েজ আদালতের আদেশে আনিস আলমগীরকে কারাগারে পাঠানো হয়।
সংশ্লিষ্ট মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলেছে, একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রয়োগ করা হয়েছে, যা স্পষ্টভাবে আইনের অপপ্রয়োগ। এই আইন মূলত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড রোধের জন্য প্রণীত, কিন্তু তা ব্যবহার করা হয়েছে সাংবাদিকতার স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত করার জন্য। এছাড়া সম্পাদক পরিষদও মন্তব্য করেছে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড অতীতের স্বৈরাচারী শাসনামলে সাংবাদিকদের প্রতি রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নের স্মৃতি জাগিয়ে দেয়।
এই ঘটনার ফলে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সাংবাদিকদের উপর এই ধরনের চাপ দেশের গণতান্ত্রিক মূলনীতি ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর প্রশ্ন তোলে। অনেক সাংবাদিক এবং বিশ্লেষক মনে করছেন, সরকারের সমালোচনায় যুক্ত হওয়ার কারণে এমন দমন-নীতি গ্রহণ করা একটি উদ্বেগজনক দিক।
কারাগারে থাকা অবস্থায় আনিস আলমগীর যে মানবিক ও নৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন, তা দেশের সাংবাদিক সম্প্রদায় ও সাধারণ জনগণের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকার রক্ষা করার ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
এই ঘটনায় অনেকেই বলছেন, সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার এবং মামলায় অন্তর্ভুক্তি গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মৌলিক নীতির পরিপন্থি। বিশেষ করে সাংবাদিকরা তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সরকারের সমালোচনা করলে এ ধরনের পদক্ষেপ তাদের পেশাগত স্বাধীনতা হরণ করে।
সর্বশেষ, দেশের সাংবাদিক সমাজ এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো পুনরায় সরকারের কাছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছে। তারা আশা করছেন, যে কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক কারণে সাংবাদিকদের উপর দমন-নীতি আরোপ করা হবে না এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে।