প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নতুন অধিবেশনের প্রথম দিনেই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন, “গণভোটের জনরায়কে প্রথম দিনেই বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শুরু হলো নতুন সংসদের যাত্রা।” মঙ্গলবার তিনি নিজ ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে এই মন্তব্য করেন।
গত বছরের গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য জুলাই জাতীয় সংসদ অনুযায়ী একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হওয়ার কথা ছিল। সেই অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা প্রথমে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন এবং তার পর সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের সুযোগ পাবেন। তবে বিএনপি থেকে নির্বাচিত ২০৯ জন সংসদ সদস্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। তারা শুধুমাত্র সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপির এই পদক্ষেপ প্রথম দিন থেকেই নতুন রাজনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সংবিধান সংস্কার কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমন অবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া সংস্কার কার্যক্রম শুরুতেই হোঁচট খাচ্ছে, যা আগামী দিনে নানান রাজনৈতিক জটিলতার পথ খুলে দিতে পারে।
বিএনপির অবস্থান অনুযায়ী, বিদ্যমান সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদ নামে কোনো পদ নেই। সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে যেসব পদ এবং শপথের বিধান রয়েছে, সেখানে সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের বিষয় বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা আছে, কিন্তু সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার কোনো বিধান নেই। প্রধান নির্বাচন কমিশনারেরও এমন শপথ পড়ানোর কোনো সাংবিধানিক এখতিয়ার নেই। বিএনপির দাবি, এই অবস্থানই সংবিধান সম্মত এবং আইনগতভাবে যথাযথ।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক সমালোচকরা মনে করছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদে শপথ না নেওয়ায় সংবিধান সংশোধনী প্রক্রিয়া কার্যত স্থগিত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে নতুন সংসদের কার্যক্রমে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে এবং সরকারের শাসনকালেও রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে পারে। বিষয়টি কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং দেশের নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের নজরেও পড়েছে।
বিএনপির সদস্যদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সংসদ অধিবেশন শুরু হওয়ার পর সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। দলটি মনে করছে, সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে পরিষদ গঠনের প্রক্রিয়া, শপথ গ্রহণ এবং কার্যক্রম অবশ্যই সংবিধানানুযায়ী ও রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আরও মনে করাচ্ছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিরোধী দলগুলোর কোনো পদক্ষেপই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ। সংবিধান সংস্কার পরিষদে শপথ না নেওয়াকে বিএনপি একটি নীতি নির্ধারক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে, যা সরকারের সংবিধান সংশোধনী কার্যক্রমে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। এই পদক্ষেপ রাজনৈতিকভাবে শক্ত অবস্থান প্রদর্শনের পাশাপাশি সংবিধান ও আইনকে প্রাধান্য দেওয়ার লক্ষণও বহন করছে।
একজন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মন্তব্য করেছেন, “বিএনপির এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে, তারা সংবিধানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করছে। কোনো সাংবিধানিক এখতিয়ার না থাকলে শপথ গ্রহণ না করাই যৌক্তিক। এটি নতুন সংসদে আইনগত স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।”
সংবিধান বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত পরিষদ কার্যত একটি রাজনৈতিক উদ্যোগ। শপথ গ্রহণ না করার মাধ্যমে বিএনপি ও সমর্থকরা সরকারের প্রস্তাবিত সংবিধান সংশোধনী নিয়ে সংবিধানানুগ প্রশ্ন তোলার সুযোগ পাচ্ছে। এ অবস্থায় রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা বেড়ে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আরও সতর্ক করে দিচ্ছেন, সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় এই ধরনের বিরোধ নতুন রাজনৈতিক সংকটের সূত্রপাত করতে পারে। সংসদ সদস্যরা যদি স্বতন্ত্রভাবে শপথ নেন, তবে তা রাজনৈতিক দূরত্ব, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং সরকারের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলে। ফলে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আরো জটিল হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে, নতুন সংসদের প্রথম দিনেই বিএনপির এমপিদের শপথ না নেওয়া, রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। এটি সরকারের শাসন ও সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় সরাসরি প্রভাব ফেলবে এবং দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দলের অবস্থান দৃঢ় করতে সহায়ক হবে।