প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের সিমেন্ট খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান প্রিমিয়ার সিমেন্ট নতুন করে ১৬১ কোটি টাকা মূলধন সংগ্রহের পরিকল্পনা নিয়েছে। এই মূলধন সংগ্রহের জন্য কোম্পানিটি অগ্রাধিকারমূলক বা প্রেফারেন্স শেয়ার ইস্যু করবে। সোমবার বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) প্রিমিয়ার সিমেন্টের এই উদ্যোগকে অনুমোদন দিয়েছে। আজ মঙ্গলবার কোম্পানিটির পক্ষ থেকে দুই স্টক এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানানো হয়।
প্রিমিয়ার সিমেন্টের পরিকল্পনা অনুযায়ী, মোট ৩২২টি প্রেফারেন্স শেয়ার ইস্যু করা হবে। প্রতিটি শেয়ারের অভিহিত বা ন্যূনতম বিক্রয় মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ লাখ টাকা। এই প্রেফারেন্স শেয়ার মূলত ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করা হবে। শেয়ারগুলো অরূপান্তরযোগ্য এবং আপাতত পাঁচ বছরের মেয়াদে নির্ধারিত।
প্রিমিয়ার সিমেন্টের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, “প্রেফারেন্স শেয়ার ছাড়ার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে উচ্চ সুদের ব্যাংকঋণ পরিশোধ এবং স্বল্পমেয়াদি ঋণকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণে রূপান্তর করা। এতে কোম্পানির নগদ অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে, যার ফলে তারল্য পরিস্থিতি মজবুত হবে এবং ব্যবসার সম্প্রসারণ সহজ হবে। উচ্চ সুদের ঋণ কমানো মানেই কোম্পানির খরচ কমানো এবং মুনাফা বৃদ্ধি। যার সুফল বিনিয়োগকারীরাও পাবেন।”
কোম্পানিটি জানিয়েছে, এই উদ্যোগের প্রাথমিক পরিকল্পনা গত বছরের জুনে নেওয়া হয়েছিল। এরপর বিএসইসির অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হয় এবং সোমবার অনুমোদন পাওয়া গেছে। এখন শেয়ারধারীদের অনুমোদনের জন্য বিশেষ সাধারণ সভা বা ইজিএম আয়োজন করা হবে, যার পর প্রেফারেন্স শেয়ার ছাড়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
প্রিমিয়ার সিমেন্ট ২০১৩ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় এবং ‘এ’ শ্রেণিভুক্ত কোম্পানি হিসেবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করেছে। সর্বশেষ জানুয়ারি ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানির শতকোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের ৪২ শতাংশ শেয়ার উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে রয়েছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৩১ শতাংশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে প্রায় ২৭ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।
ফাইন্যান্সিয়াল পারফরম্যান্সের দিকে নজর দিলে দেখা যায়, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে প্রিমিয়ার সিমেন্ট প্রায় ১৪ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল। ওই বছরে কোম্পানিটি শেয়ারধারীদের মধ্যে ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ বিতরণ করে, যার মধ্যে প্রিমিয়ার সিমেন্ট প্রায় সাড়ে ১০ কোটি টাকা শেয়ারধারীদের হাতে পৌঁছে দিয়েছে। এছাড়া, সর্বশেষ গত অক্টোবর–ডিসেম্বর প্রান্তিকের হিসাব অনুযায়ী কোম্পানির মুনাফা দাঁড়ায় ৭৪ লাখ টাকা, যার ফলে শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস ৭ পয়সা।
প্রেফারেন্স শেয়ার ছাড়ার খবরে আজ মঙ্গলবার শেয়ারবাজারে কোম্পানিটির শেয়ারের দামও বাড়তে দেখা গেছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেনের প্রথম ঘণ্টায় কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ৪০ পয়সা বা ১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪০ টাকায়। এ সময়ের মধ্যে প্রায় সাড়ে ২৯ হাজার শেয়ার হাতবদল হয়। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রেফারেন্স শেয়ার ছাড়ার মাধ্যমে কোম্পানির আর্থিক ভিত্তি মজবুত হওয়ার খবর বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে আরও শক্ত করবে।
কোম্পানির বর্তমান উদ্যোগে উচ্চ সুদের ঋণ কমানো, নগদ অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি, এবং তারল্য পরিস্থিতি উন্নত করার পাশাপাশি মুনাফা বৃদ্ধির প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এ ধরনের উদ্যোগ সাধারণভাবে বিনিয়োগকারীদের জন্য ইতিবাচক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হয়। কোম্পানির আর্থিক স্বচ্ছতা, নিয়মিত লভ্যাংশ প্রদান এবং মূলধন বৃদ্ধির কার্যক্রম বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও দৃঢ় করবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রিমিয়ার সিমেন্টের এই প্রেফারেন্স শেয়ার ছাড়ার উদ্যোগ শুধুমাত্র কোম্পানির নগদ প্রবাহ এবং ঋণ ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করবে না, বরং এটি শেয়ারবাজারে কোম্পানির মান ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হবে। দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা এবং আর্থিক দৃঢ়তা নিশ্চিত করতে এই ধরনের মূলধন সংগ্রহ কার্যক্রম বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীরা প্রিমিয়ার সিমেন্টের এই পদক্ষেপকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করছেন, কারণ এটি কোম্পানির মূলধন শক্তিশালী করবে এবং ঋণ পরিশোধের মাধ্যমে মুনাফা বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি করবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ঋণ কমানো এবং নগদ অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি কোম্পানির ব্যবসায়িক সম্প্রসারণকে সহজ করবে, যা ভবিষ্যতে শেয়ারধারীদের জন্য আরও সুফল বয়ে আনবে।
প্রিমিয়ার সিমেন্টের এই উদ্যোগ দেশের সিমেন্ট খাতের জন্যও এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে, কারণ এটি দেখাবে কিভাবে কোম্পানিগুলো প্রেফারেন্স শেয়ার ব্যবহার করে ঋণ পরিশোধ ও মূলধন বৃদ্ধি করতে পারে।