প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে অনুষ্ঠিত গণভোটের ফলাফল বাতিল এবং পুরো গণভোট প্রক্রিয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন এক আইনজীবী। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক অঙ্গন, আইন বিশেষজ্ঞ মহল এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। গণভোটের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি জাতীয় সিদ্ধান্ত আদালতের বিচারিক পর্যালোচনার মুখে পড়ায় দেশের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ও গণতান্ত্রিক কাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট–এর আইনজীবী এ বি এম আতাউল মজিদ তৌহিদ জনস্বার্থে এই রিট আবেদন দায়ের করেন। রিটটি দায়ের করা হয়েছে বাংলাদেশ হাইকোর্ট বিভাগ–এ। রিট আবেদনে গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করার পাশাপাশি ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত গণভোটের ফলাফল ও গেজেট বাতিলের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
রিটে শুধু ফলাফল বাতিলের আবেদনই নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে। আবেদনকারী আদালতের কাছে এই মর্মে ঘোষণাও চেয়েছেন যে, ভবিষ্যতে কোনো অন্তর্বর্তী সরকার বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার যেন গণভোট আয়োজন করতে না পারে। এই আবেদন দেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামোর জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, কারণ এটি ভবিষ্যতের সরকারব্যবস্থা ও ক্ষমতার সীমা নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।
গত বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি এই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরদিন, অর্থাৎ শুক্রবার দিবাগত রাতে আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল প্রকাশ করে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। একই সঙ্গে সরকারি গেজেটও প্রকাশ করা হয়, যার মাধ্যমে গণভোটের ফলাফলকে আইনগত স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গণভোটে মোট ভোটার ছিলেন ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে ভোট প্রদান করেছেন প্রায় ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ ভোটার, যা একটি উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায়, ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯টি, যা মোট প্রদত্ত ভোটের বড় অংশ। অন্যদিকে ‘না’ ভোট পড়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭টি। এছাড়া বাতিল হয়েছে ৭৪ লাখ ২২ হাজার ৬৩৭টি ভোট।
এই গণভোটের মূল উদ্দেশ্য ছিল ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ এবং সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাবের বিষয়ে জনগণের মতামত নেওয়া। নির্বাচন কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, জনগণের বিপুল সমর্থনের মাধ্যমে এই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের আইনি পথ উন্মুক্ত হয়েছে। গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কারের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে পারবে।
তবে এই ফলাফল ঘোষণার পরপরই বিভিন্ন মহলে এ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। বিশেষ করে গণভোট আয়োজনের প্রক্রিয়া, এর সাংবিধানিক বৈধতা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতার সীমা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এসব প্রশ্নের প্রেক্ষাপটেই আদালতে এই রিট আবেদন দায়ের করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, গণভোট একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হলেও এটি আয়োজনের ক্ষেত্রে সংবিধানের বিধান কঠোরভাবে অনুসরণ করা আবশ্যক। যদি কোনো প্রক্রিয়াগত বা সাংবিধানিক ত্রুটি থাকে, তাহলে আদালত সেই বিষয়টি পর্যালোচনা করতে পারে। এই রিটের মাধ্যমে মূলত সেই সাংবিধানিক প্রশ্নগুলোর বিচারিক ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
রিট আবেদনকারী আইনজীবী মনে করেন, গণভোট আয়োজনের ক্ষেত্রে আইনগত ও সাংবিধানিক কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। তিনি আদালতের কাছে এই বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যেই জানানো হয়েছে, গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫–এর ১৬(৩) ধারা অনুযায়ী এই ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়া আইনসম্মতভাবে সম্পন্ন হয়েছে। কমিশনের কর্মকর্তারা দাবি করছেন, গণভোটের প্রতিটি ধাপ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং জনগণের রায় যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই রিট দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। আদালত যদি এই রিট গ্রহণ করে এবং শুনানির জন্য নির্ধারণ করে, তাহলে গণভোটের বৈধতা নিয়ে বিস্তারিত আইনি আলোচনা হবে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দিকনির্দেশনা পাওয়া যেতে পারে।
এদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। অনেকেই জানতে চাইছেন, আদালতের সিদ্ধান্ত কী হবে এবং তা দেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামোর ওপর কী প্রভাব ফেলবে। গণভোটের মাধ্যমে যে সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা আদালতের রায়ের ওপর নির্ভর করে নতুন মোড় নিতে পারে।
সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আদালতের এই ধরনের পর্যালোচনা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি নিশ্চিত করে যে, রাষ্ট্রীয় সব সিদ্ধান্ত সংবিধান ও আইনের সীমার মধ্যেই নেওয়া হচ্ছে।
এখন সবার নজর আদালতের দিকে। হাইকোর্ট এই রিট আবেদন গ্রহণ করে শুনানির জন্য নির্ধারণ করবে কি না এবং করলে কী ধরনের পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা দেবে, সেটিই হয়ে উঠেছে প্রধান আলোচ্য বিষয়। আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে গণভোটের ফলাফল এবং এর ভিত্তিতে নেওয়া ভবিষ্যৎ পদক্ষেপগুলোর ভাগ্য।