প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ক্রিকেট কখনো কখনো এমন নির্মম গল্প লিখে, যেখানে ব্যক্তিগত অর্জনের আলো দলীয় পরাজয়ের অন্ধকারে ঢাকা পড়ে যায়। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মঞ্চে কানাডার ১৯ বছর বয়সী তরুণ ওপেনার যুবরাজ শর্মা ঠিক তেমনই এক গল্পের জন্ম দিলেন। ব্যাট হাতে তিনি যা করলেন, তা শুধু কানাডার নয়, পুরো ক্রিকেট বিশ্বের জন্যই বিস্ময় হয়ে থাকবে। কিন্তু তার ঐতিহাসিক সেঞ্চুরিও শেষ পর্যন্ত দলকে জয় এনে দিতে পারল না। শক্তিশালী নিউজিল্যান্ড জাতীয় ক্রিকেট দল দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে জয় তুলে নিয়ে নিশ্চিত করল সুপার এইটে জায়গা।
মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) চেন্নাইয়ের গরম আবহাওয়ায় অনুষ্ঠিত গ্রুপ ডি’র ম্যাচে কানাডাকে ৮ উইকেট ও ২৯ বল হাতে রেখে হারিয়েছে নিউজিল্যান্ড। স্কোরবোর্ড বলছে সহজ জয়, কিন্তু ম্যাচের ভেতরে ছিল নাটক, রেকর্ড, প্রতিশ্রুতি আর ভবিষ্যতের সম্ভাবনার এক অনন্য গল্প।
ম্যাচের শুরুতেই টস জিতে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেয় কানাডা জাতীয় ক্রিকেট দল। তাদের লক্ষ্য ছিল বড় স্কোর গড়া, যাতে নিউজিল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দলকে চাপে রাখা যায়। ওপেনিংয়ে নামা যুবরাজ শর্মা শুরু থেকেই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। তার ব্যাটিংয়ে ছিল দৃঢ়তা, আক্রমণ আর পরিণত মনোভাবের অসাধারণ মিশ্রণ।
মাত্র ১৯ বছর ১৪১ দিন বয়সে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মঞ্চে সেঞ্চুরি করে তিনি নতুন ইতিহাস লিখলেন। ৬৫ বলের ইনিংসে ১১টি চার ও ৬টি ছক্কার সাহায্যে ১১০ রান করেন তিনি। তার এই সেঞ্চুরি তাকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ান বানিয়েছে। এর আগে এই রেকর্ড ছিল পাকিস্তানের আহমেদ শেহজাদ–এর দখলে, যিনি ২০১৪ সালে ২২ বছর বয়সে বাংলাদেশের বিপক্ষে শতরান করেছিলেন।
যুবরাজ শর্মার নাম শুনলেই অনেকের মনে পড়ে যায় ভারতের কিংবদন্তি অলরাউন্ডার যুবরাজ সিং–এর কথা। নামের মিলের মতোই ব্যাটিংয়ের আগ্রাসনেও যেন সেই ছায়া খুঁজে পাওয়া গেল। মাঠজুড়ে তার শট নির্বাচন, আত্মবিশ্বাস এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেখে বোঝা যায়, ভবিষ্যতে তিনি বড় কিছু করার সামর্থ্য রাখেন।
তার সঙ্গে ওপেনিংয়ে অধিনায়ক দিলপ্রিত বাজওয়া দলকে দারুণ সূচনা এনে দেন। দুজনের জুটিতে আসে ১১৬ রান, যা কানাডার ইনিংসের ভিত্তি গড়ে দেয়। বাজওয়া ৩৯ বলে ৩৬ রান করে আউট হলেও যুবরাজ নিজের কাজ চালিয়ে যান। দলের অন্য ব্যাটাররা বড় রান করতে না পারলেও তিনি একাই স্কোরবোর্ড সচল রাখেন।
শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত ২০ ওভারে ৪ উইকেট হারিয়ে ১৭৩ রান সংগ্রহ করে কানাডা। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে এটি একটি প্রতিযোগিতামূলক স্কোর হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছিল।
নিউজিল্যান্ডের হয়ে বোলিংয়ে জ্যাকব ডাফি, ম্যাট হেনরি, কাইল জেমিসন ও জিমি নিশাম একটি করে উইকেট নেন। তবে তাদের বোলিংয়ের ওপর স্পষ্টভাবেই আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন তরুণ কানাডিয়ান ওপেনার যুবরাজ।
১৭৪ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুটা ভালো হয়নি নিউজিল্যান্ডের। দ্রুত দুই উইকেট হারিয়ে কিছুটা চাপে পড়ে যায় তারা। টিম সেইফার্ট ও ফিন অ্যালেনের বিদায়ে স্কোরবোর্ডে তখন মাত্র ৩০ রান।
কিন্তু এরপরই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন দুই অভিজ্ঞ ও প্রতিভাবান ব্যাটার। রাচিন রবীন্দ্র এবং গ্লেন ফিলিপস মিলে গড়ে তোলেন ম্যাচজয়ী জুটি। তাদের ব্যাটিং ছিল আত্মবিশ্বাসে ভরপুর এবং আক্রমণাত্মক।
রবীন্দ্র ৩৯ বলে ৫৯ রান করেন, যেখানে ছিল চারটি চার ও তিনটি ছক্কা। অন্যদিকে ফিলিপস ছিলেন আরও বিধ্বংসী। মাত্র ৩৬ বলে ৭৬ রান করে তিনি কানাডার বোলারদের ওপর একপ্রকার ঝড় বয়ে দেন। তার ইনিংসে ছিল চারটি চার ও ছয়টি ছক্কা।
এই জুটির ১৪৬ রানের অবিচ্ছিন্ন পার্টনারশিপ ম্যাচটিকে পুরোপুরি নিউজিল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। শেষ পর্যন্ত ১৫.১ ওভারেই জয় নিশ্চিত করে তারা।
এই জয়ের মাধ্যমে শুধু ম্যাচই জেতেনি নিউজিল্যান্ড, তারা নিশ্চিত করেছে সুপার এইট পর্বে নিজেদের জায়গা। এটি তাদের জন্য বড় একটি আত্মবিশ্বাসের উৎস হয়ে থাকবে।
অন্যদিকে কানাডার জন্য এই ম্যাচটি পরাজয়ের হলেও এটি ভবিষ্যতের জন্য আশার আলো দেখিয়েছে। বিশেষ করে যুবরাজ শর্মার পারফরম্যান্স প্রমাণ করেছে, তাদের দলে বিশ্বমানের খেলোয়াড় তৈরি হচ্ছে।
ম্যাচ শেষে ক্রিকেট বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সেঞ্চুরি শুধু একটি ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি কানাডার ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম বড় মুহূর্ত। বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে এমন পারফরম্যান্স তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
যুবরাজ শর্মা নিজেও ম্যাচ শেষে কিছুটা আবেগপ্রবণ ছিলেন। দলকে জেতাতে না পারার আক্ষেপ থাকলেও নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে তিনি গর্বিত। তার চোখে ছিল ভবিষ্যতে আরও ভালো করার প্রত্যয়।
ক্রিকেটের সৌন্দর্য এখানেই, যেখানে এক ম্যাচেই জন্ম নেয় নতুন নায়ক। কানাডা হয়তো ম্যাচটি হেরেছে, কিন্তু তারা পেয়েছে এক সম্ভাবনাময় তারকা। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ড প্রমাণ করেছে কেন তারা বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম শক্তিশালী দল।
এই ম্যাচের গল্প তাই শুধু জয় বা পরাজয়ের নয়, এটি স্বপ্ন, সম্ভাবনা এবং নতুন ইতিহাসের গল্প।