আলোচনার আগে রাশিয়া-ইউক্রেনের ভয়াবহ পাল্টা হামলা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫ বার
আলোচনার আগে রাশিয়া-ইউক্রেনের ভয়াবহ পাল্টা হামলা

প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুদ্ধ কখনোই শুধু সীমান্তের মানচিত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি মানুষের ঘর, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যতের ওপর আঘাত হানে। সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আবারও সেই নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হলো রাশিয়া ও ইউক্রেন। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে শান্তি আলোচনার আগে দুই দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে, যাতে আহত হয়েছেন একাধিক বেসামরিক মানুষ এবং ধ্বংস হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, এই হামলা-পাল্টা হামলা এমন এক সময় ঘটছে যখন চার বছর ধরে চলা এই ভয়াবহ যুদ্ধ নতুন করে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনার দিকে এগোচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র–এর মধ্যস্থতায় সুইজারল্যান্ড–এর জেনেভা শহরে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শুরু হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আগ্রহের জন্ম দিয়েছে।

এই বৈঠকের ঠিক আগের রাতেই ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় রাশিয়া। ইউক্রেনের বিমান বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, এক রাতেই ৩৯৬টি ড্রোন এবং ২৯টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। রাতের আঁধারে হঠাৎ করে সাইরেন বেজে ওঠে, মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে যায়। অনেক পরিবার শিশুদের নিয়ে ভূগর্ভস্থ আশ্রয়ে রাত কাটাতে বাধ্য হয়।

ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অধিকাংশ হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। তারা দাবি করেছে, ৩৬৭টি ড্রোন এবং ২৫টি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করা হয়েছে। তবুও কিছু ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। আবাসিক ভবন, শিল্প এলাকা এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে ওডেসা এবং দেনিপ্রোপেট্রোভস্ক অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। এসব এলাকায় বহু মানুষ আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে।

ওডেসার এক বাসিন্দা স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমরা ভেবেছিলাম যুদ্ধ হয়তো কিছুটা থামবে, কিন্তু গত রাতের বিস্ফোরণ আমাদের আবারও ভয় পাইয়ে দিয়েছে। আমার ছেলেটা সারারাত কাঁদছিল।”

রাশিয়ার এই হামলার জবাব দিতেও দেরি করেনি ইউক্রেন। তারা রাতভর ড্রোন হামলা চালায় রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর। বিশেষ করে ক্রাসনোদার অঞ্চলের ইলস্কি তেল শোধনাগার লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, একটি তেল সংরক্ষণ ট্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আগুন ধরে যায়। যদিও আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে, তবুও এতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এছাড়া রুশ-নিয়ন্ত্রিত ক্রিমিয়া উপদ্বীপেও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। ক্রিমিয়ার বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। ক্রিমিয়ার রাজধানী সেভাস্তোপল–এর গভর্নর মিখাইল রাজভোঝায়েভ জানিয়েছেন, এটি ছিল সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে দীর্ঘ ও তীব্র হামলাগুলোর একটি। সেখানে প্রায় দুই ডজন ড্রোন ভূপাতিত করা হয়। তবে হামলায় এক শিশুসহ কয়েকজন আহত হয়েছে বলে জানা গেছে।

রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তারা রাতভর ১৫১টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ধ্বংস করেছে। তবে ইউক্রেনের পক্ষ থেকে এই দাবির পূর্ণ সত্যতা নিশ্চিত করা হয়নি।

এই হামলা-পাল্টা হামলার পেছনে শুধু সামরিক কৌশল নয়, রয়েছে রাজনৈতিক বার্তাও। বিশ্লেষকরা বলছেন, জেনেভার আলোচনার আগে উভয় পক্ষ নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে আলোচনার টেবিলে সুবিধাজনক অবস্থান নিতে চাইছে।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে এটিই সবচেয়ে বড় যুদ্ধ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই চার বছরে লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং ইউক্রেনের বহু শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

যুদ্ধের দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পর এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একটি স্থায়ী সমাধানের আশা করছে। জেনেভার এই বৈঠক সেই আশার প্রতীক হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো, যুদ্ধক্ষেত্রে এখনও প্রতিদিন হামলা চলছে এবং মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই আলোচনায় যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তা এবং বন্দি বিনিময়সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে। যদিও কোনো বড় সমঝোতা হবে কি না, তা এখনও অনিশ্চিত।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই যুদ্ধ শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি বৈশ্বিক রাজনীতি এবং অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলেছে। জ্বালানি সংকট, খাদ্য মূল্য বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এই যুদ্ধের কারণে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। যারা প্রতিদিন বোমার শব্দে ঘুম ভাঙায়, যারা জানে না আগামীকাল তাদের ঘর থাকবে কি না।

জেনেভার আলোচনায় হয়তো যুদ্ধের তাৎক্ষণিক সমাধান না-ও আসতে পারে, কিন্তু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কারণ যুদ্ধের মাঝেও আলোচনার দরজা খোলা থাকাটা ভবিষ্যতের শান্তির সম্ভাবনাকে বাঁচিয়ে রাখে।

যুদ্ধের এই চতুর্থ বছরে এসে বিশ্ববাসী একটাই প্রশ্ন করছে—এই রক্তপাত কবে থামবে? জেনেভার বৈঠক কি সেই উত্তরের সূচনা হতে পারবে, নাকি যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হবে—সেই উত্তর সময়ই বলে দেবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত