প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পবিত্র রমজান মাস মুসলমানদের জন্য আত্মসংযম, আত্মশুদ্ধি ও মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক বিশেষ সময়। ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থেকে রোজা পালন শুধু ধর্মীয় ইবাদতই নয়, এটি শরীর ও মনের ওপরও বিশেষ প্রভাব ফেলে। এক মাসের এই ভিন্নধর্মী জীবনযাত্রার সঙ্গে শরীরকে মানিয়ে নিতে সময় লাগে, বিশেষ করে প্রথম কয়েকটি রোজা অনেকের জন্য কিছুটা কঠিন হয়ে ওঠে। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুরু থেকেই সচেতন থাকলে রোজা পালন যেমন সহজ হয়, তেমনি শরীরও থাকে সুস্থ ও কর্মক্ষম।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বছরের অন্য সময়ের তুলনায় রমজানে খাদ্যাভ্যাস, ঘুমের সময়সূচি এবং দৈনন্দিন কাজের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা, পানিশূন্যতা এবং ঘুমের ঘাটতির কারণে প্রথম কয়েকদিন অনেকেই দুর্বলতা, মাথাব্যথা বা ক্লান্তি অনুভব করেন। তবে সঠিক পরিকল্পনা ও সচেতনতার মাধ্যমে এই সমস্যাগুলো সহজেই এড়ানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রমজান শুরু হওয়ার আগেই শরীরকে প্রস্তুত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যারা নিয়মিত চা বা কফি পান করেন, তারা যদি হঠাৎ করে তা বন্ধ করে দেন, তাহলে মাথাব্যথা বা অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। তাই রোজার অন্তত এক থেকে দুই সপ্তাহ আগে থেকেই ক্যাফেইন গ্রহণ ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা ভালো। একইভাবে অতিরিক্ত নোনতা বা প্রক্রিয়াজাত খাবার কমিয়ে দিয়ে পুষ্টিকর খাবারের পরিমাণ বাড়াতে হবে। এতে শরীর নতুন খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে সহজে মানিয়ে নিতে পারে।
রোজার প্রথম কয়েকদিন সেহরি ও ইফতারের খাবার নির্বাচনে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। সেহরি এমন হওয়া উচিত, যা দীর্ঘ সময় শরীরে শক্তি জোগাতে পারে। প্রোটিন ও ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার যেমন ডিম, ডাল, দুধ, সবজি এবং পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবার দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখে এবং শক্তি ধরে রাখতে সাহায্য করে। অনেকেই সেহরিতে কম খেয়ে থাকেন বা শুধু পানি পান করে থাকেন, যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। কারণ এতে দিনের বেলা দ্রুত দুর্বলতা চলে আসে।
ইফতারের সময়ও সচেতনতা জরুরি। সারাদিন না খেয়ে থাকার পর অনেকেই অতিরিক্ত খাবার খেয়ে ফেলেন, যা হজমের সমস্যা সৃষ্টি করে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, ইফতার শুরু করা উচিত খেজুর ও পানি দিয়ে, যা দ্রুত শরীরে শক্তি ফিরিয়ে আনে। এরপর ধীরে ধীরে ফলমূল, সবজি ও হালকা খাবার খাওয়া ভালো। অতিরিক্ত তেলযুক্ত বা ভাজাপোড়া খাবার শরীরের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে এবং পানিশূন্যতা বাড়িয়ে দিতে পারে।
পানিশূন্যতা রোজার সময় একটি বড় সমস্যা। তাই ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত পর্যাপ্ত পানি পান করা অত্যন্ত জরুরি। অনেকেই একসঙ্গে বেশি পানি পান করেন, যা শরীরের জন্য খুব একটা উপকারী নয়। বরং অল্প অল্প করে বারবার পানি পান করলে শরীর ভালোভাবে পানি শোষণ করতে পারে। ডাবের পানি, ফলের রস এবং পানিযুক্ত ফল শরীরকে সতেজ রাখতে সাহায্য করে।
রোজার শুরুতে শরীরে কিছু পরিবর্তন হওয়া স্বাভাবিক। অনেকেই প্রথম কয়েকদিন মাথাব্যথা, ঝিমুনি বা ক্লান্তি অনুভব করেন। এটি মূলত শরীরের নতুন নিয়মে অভ্যস্ত হওয়ার প্রক্রিয়ার অংশ। এই সময় পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন। দিনের বেলা সুযোগ থাকলে কিছু সময় বিশ্রাম নিলে শরীর দ্রুত শক্তি ফিরে পায়।
ব্যায়ামের ক্ষেত্রেও কিছু সতর্কতা প্রয়োজন। ভারী ব্যায়াম শরীরকে আরও ক্লান্ত করে তুলতে পারে। তাই রোজার প্রথম কয়েকদিন হালকা হাঁটাহাঁটি বা সহজ ব্যায়াম করা ভালো। এতে শরীর সচল থাকে এবং ক্লান্তিও কম লাগে। বিশেষ করে ইফতারের পর হালকা হাঁটা হজমের জন্য উপকারী।
পুষ্টিবিদরা আরও বলছেন, রোজার সময় হঠাৎ করে খাদ্যাভ্যাসে বড় পরিবর্তন না এনে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনাই ভালো। এতে শরীর সহজে নতুন নিয়মের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে। যারা আগে অনিয়মিত খাবার খেতেন, তাদের জন্য এটি একটি ভালো সুযোগ নিয়মিত ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার।
রমজান শুধু ধর্মীয় ইবাদতের সময় নয়, এটি শরীর ও মনের যত্ন নেওয়ারও সময়। সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রা অনুসরণ করলে এই মাসটি হয়ে উঠতে পারে সুস্থতা অর্জনের একটি সুযোগ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতনভাবে রোজা পালন করলে এটি শরীরের জন্য উপকারী হতে পারে এবং জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সাহায্য করে।
এছাড়া রমজান মাসে মানসিক প্রশান্তিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত নামাজ এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাস শরীর ও মনকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। যারা প্রথম কয়েকদিন সচেতনভাবে নিজেদের যত্ন নেন, তাদের জন্য পুরো মাস রোজা পালন অনেক সহজ হয়ে যায়।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রমজান মাস মুসলমানদের জীবনে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বাংলাদেশ-এর মতো দেশে এই মাসে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়ও বড় পরিবর্তন দেখা যায়। পরিবার, সমাজ এবং ধর্মীয় অনুশীলনের মধ্যে এক বিশেষ বন্ধন তৈরি হয়।
সবশেষে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোজার শুরু থেকেই সচেতন থাকলে শরীর দ্রুত নতুন নিয়মের সঙ্গে মানিয়ে নেয় এবং পুরো মাস সুস্থভাবে রোজা পালন করা সম্ভব হয়। তাই প্রথম কয়েকটি রোজাকে গুরুত্ব দিয়ে সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পানি পান এবং বিশ্রামের মাধ্যমে শরীরকে প্রস্তুত রাখা জরুরি। এতে ইবাদত যেমন সুন্দরভাবে পালন করা যাবে, তেমনি শরীরও থাকবে সুস্থ ও সতেজ।