জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পরমাণু আলোচনার নতুন পর্ব

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৬ বার
জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পরমাণু আলোচনার নতুন পর্ব

প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম স্পর্শকাতর ইস্যু ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আবারও আলোচনার টেবিলে মুখোমুখি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। দীর্ঘদিনের উত্তেজনা, অবিশ্বাস এবং সংঘাতের ছায়া পেরিয়ে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় শুরু হয়েছে দুই দেশের দ্বিতীয় দফার পরোক্ষ আলোচনা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই আলোচনা ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ, পাশাপাশি শঙ্কাও রয়েছে—এই আলোচনা কি নতুন কোনো সমঝোতার পথ খুলে দেবে, নাকি আরও অনিশ্চয়তার জন্ম দেবে?

মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) স্থানীয় সময় সকাল ৯টায় জেনেভা শহরে এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শুরু হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আলোচনা স্থানীয় সময় বিকেল পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে। আলোচনায় দুই দেশের প্রতিনিধিরা সরাসরি মুখোমুখি না হলেও মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন। এটি মূলত একটি ‘পরোক্ষ আলোচনা’, যেখানে কূটনৈতিক ভাষা, কৌশল এবং পারস্পরিক বার্তা বিনিময়ের মাধ্যমে সম্ভাব্য সমঝোতার পথ খোঁজা হচ্ছে।

এই আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প-এর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার এবং হোয়াইট হাউসের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। যদিও ট্রাম্প নিজে সরাসরি আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন না, তবে তিনি আগেই জানিয়েছেন যে তিনি এই আলোচনার সঙ্গে পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছেন এবং পুরো প্রক্রিয়ার ওপর নজর রাখছেন। অন্যদিকে ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি, যিনি এই আলোচনাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন।

এই আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন বদর আল বুসাইদি। ওমান দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পরিচিত। উভয় পক্ষই ওমানের এই ভূমিকার প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলমান বিরোধের একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করা। ইরান দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং এটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গবেষণার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা দীর্ঘদিন ধরে আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছে যে, এই কর্মসূচির আড়ালে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে।

এই আলোচনার আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার প্রধান রাফায়েল গ্রোসি-এর সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের পর তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, ইরান একটি ন্যায্য এবং সম্মানজনক চুক্তি চায়। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, ইরান কোনো ধরনের হুমকির কাছে আত্মসমর্পণ করবে না এবং নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে।

অন্যদিকে ট্রাম্প এই আলোচনার প্রেক্ষাপটে ইরানের প্রতি কঠোর বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, অতীতে ইরান কঠোর অবস্থান নিয়েছিল, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের পর তারা পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করেছে। তাঁর মতে, ইরান এবার একটি সমঝোতার দিকে এগিয়ে আসতে পারে, কারণ তারা আর সংঘাতের ঝুঁকি নিতে চাইবে না।

এই আলোচনার সময় মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনাও চরমে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ওই অঞ্চলে দ্বিতীয় একটি বিমানবাহী রণতরি মোতায়েন করেছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আলোচনায় ব্যর্থতা এলে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের প্রস্তুতিও রাখা হচ্ছে। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই আলোচনার সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থানের ওপর। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক হাসান আহমাদিয়ান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজস্ব কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রেখে আলোচনা চালায়, তাহলে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে। তিনি আরও বলেন, অতীতে ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির মতো একটি কাঠামো আবারও তৈরি হতে পারে, যদি উভয় পক্ষ বাস্তবসম্মত এবং গ্রহণযোগ্য প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে আসে।

২০১৫ সালে ইরান এবং বিশ্বশক্তিগুলোর মধ্যে একটি ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি হয়েছিল, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র সেই চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ালে আবারও উত্তেজনা শুরু হয়। সেই প্রেক্ষাপটে বর্তমান আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

এই আলোচনার মানবিক দিকও রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই উত্তেজনার কারণে সাধারণ মানুষের জীবনেও ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে দেশটির অর্থনীতি চাপে পড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও এই উত্তেজনার কারণে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

আন্তর্জাতিক কূটনীতিকরা মনে করছেন, এই আলোচনা শুধু দুই দেশের সম্পর্কের জন্য নয়, বরং পুরো বিশ্বের নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যদি এই আলোচনার মাধ্যমে একটি স্থায়ী সমাধান পাওয়া যায়, তাহলে তা বিশ্ব রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

তবে এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না, এই আলোচনা শেষ পর্যন্ত কী ফল বয়ে আনবে। উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানে দৃঢ় রয়েছে, আবার একই সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজে পাওয়ার আগ্রহও প্রকাশ করছে। এই দ্বৈত অবস্থানই আলোচনাকে জটিল এবং অনিশ্চিত করে তুলেছে।

বিশ্ব এখন অপেক্ষা করছে জেনেভার এই আলোচনার ফলাফলের জন্য। এই আলোচনা কি নতুন করে শান্তির দ্বার খুলে দেবে, নাকি উত্তেজনার নতুন অধ্যায় শুরু করবে—তার উত্তর লুকিয়ে আছে কূটনীতির এই সূক্ষ্ম এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ার মধ্যেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত