প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর ধানমন্ডিতে ছয় বছর আগে ঘটে যাওয়া হৃদয়বিদারক হত্যাকাণ্ডে আদালত এক চরম রায় দিয়েছেন। ২০১৯ সালের ১ নভেম্বর রাতে ধানমন্ডির ‘লোবেলিয়া হাউজ’ ভবনের পঞ্চম তলায় শিল্পপতি কাজী মনির উদ্দিন তারিমের শাশুড়ি আফরোজা বেগম (৬৫) ও গৃহকর্মী দিতিকে (১৮) গলা কেটে হত্যা করার ঘটনায় গৃহকর্মী সুরভী আক্তার নাহিদের ফাঁসির রায় ঘোষণা করা হয়েছে। অপর আসামি বাচ্চু মিয়া খালাস পেয়েছেন।
ঢাকার সপ্তম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ তাওহীদা আক্তারের আদালত মঙ্গলবার দুপুরে এই রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় দেড়টার দিকে দুই আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। বিচারক মামলার অভিযোগপত্র ও সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যালোচনা পড়ে শোনান এবং বেলা ৩টা ১৭ মিনিটে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার পর খালাস পাওয়া আসামি বাচ্চু মিয়া কান্নায় ভেঙে পড়েন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মাহফুজ হাসান এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত নির্মম। নিহত আফরোজা বেগম ও গৃহকর্মী দিতি ছিলেন ধানমন্ডি এলাকায় ‘লোবেলিয়া হাউজ’-এর পঞ্চম তলায়। সেদিন রাতে তাঁদের রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। হত্যাকাণ্ডের ধরণ ছিল শ্বাসরোধকারী এবং পরিকল্পিত, কারণ দুজনকেই সরাসরি গলা কেটে হত্যা করা হয়েছিল। আফরোজা বেগমের থাকার ফ্ল্যাটটি ভবনের এক পাশের দিকে এবং একই ভবনের ছয়তলার ফ্ল্যাটে তার মেয়ের পরিবার বসবাস করত। এই পরিবারের মেয়ে দিলরুবা সুলতানা রুবা, যা ঘটনার মাত্র দুই দিন পর পুলিশের কাছে মামলা দায়ের করেন।
২০১৯ সালের হত্যার পর রাজধানীজুড়ে গোয়েন্দা বিভাগের তদন্ত শুরু হয়। ২০২২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পিবিআই’র (প্রবাসী তদন্ত সংস্থা) তদন্ত কর্মকর্তা মজিবুর রহমান দোষীদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এই মামলায় অভিযুক্ত ছিলেন বাচ্চু মিয়া ও সুরভী আক্তার নাহিদ। ওই বছরের ১১ অক্টোবর আদালত দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন এবং বিচার কার্যক্রম শুরু হয়।
বিচারের সময় আদালত মোট ৩২ জন সাক্ষীর মধ্যে ২৩ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। সাক্ষীদের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী, প্রতিবেশী, পুলিশ ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা ছিলেন। আদালত মামলার সাক্ষ্যসমূহ বিশদভাবে যাচাই-বাছাই করে অপরাধের যথাযথ প্রমাণ উপস্থাপন করেন। বিচারক জানান, সুরভী আক্তার নাহিদ হত্যাকাণ্ডের সময় সরাসরি উপস্থিত ছিলেন এবং পরিকল্পিতভাবে দুজনকে হত্যা করেছেন। অপরদিকে বাচ্চু মিয়ার উপস্থিতি ও ভূমিকা প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
এই হত্যাকাণ্ড কেবল পরিবার নয়, সমগ্র ধানমন্ডি এলাকায় শোকের ছায়া ফেলে। নিহত আফরোজা বেগম ছিলেন একজন প্রভাবশালী শিল্পপতির স্ত্রী এবং স্থানীয় সমাজে পরিচিত ব্যক্তি। অপর নিহত গৃহকর্মী দিতি, মাত্র ১৮ বছর বয়সী, যিনি নিরীহভাবে জীবিকা নির্বাহ করছিলেন, সেই নির্মমভাবে নিহত হওয়া কাহিনী পুরো দেশকে আঘাত করেছে। স্থানীয়রা বলেন, “এমন পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড আমরা ভাবতেও পারিনি। পরিবার ও প্রতিবেশী সকলেই ধাক্কা খেয়েছে।”
মামলার দীর্ঘদিন ধরে চলা বিচারের প্রক্রিয়া ও সর্বশেষ ফাঁসির রায় জনগণের মনে ন্যায়বিচারের বিশ্বাসকে জাগিয়ে তুলেছে। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মন্তব্য করেছেন যে, এই রায় প্রমাণ করে, কোনো অপরাধ নির্বিশেষে সাজা পাবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হত্যাকাণ্ডের মতো হিংস্র অপরাধে দ্রুত বিচার ও শাস্তি অপরিহার্য।
এই ঘটনাটি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গভীরভাবে দুঃখজনক। এক তরুণীর জীবন ফুরিয়ে যাওয়ায় সমাজে নতুন দুঃখের ছাপ পড়ে। নিহত আফরোজা বেগমের পরিবার এখনও মানসিকভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত। আদালতের রায় ঘোষণা হওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা শোকাহত হলেও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে ন্যায়ের পথ চলতে বাধ্য।
ধানমন্ডি হত্যা কেবল একটি ব্যক্তিগত দুর্ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের বড় শহরে নিরাপত্তা, গৃহকর্মী সুরক্ষা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার আলোচনার বিষয় হিসেবে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গৃহকর্মীদের প্রতি সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো, পরিবারে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।
এই হত্যাকাণ্ডের রায় প্রমাণ করেছে যে, বিচার ব্যবস্থা দীর্ঘ হলেও কার্যকর এবং সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম। ফাঁসির রায় সুরভী আক্তার নাহিদের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক হয়ে থাকবে। একই সঙ্গে বাচ্চু মিয়ার খালাস দেখিয়েছে যে, আদালত ন্যায়ের পথে সঠিক বিচারের জন্য প্রমাণ ও সাক্ষ্য বিবেচনা করে।
ধারাবাহিক তদন্ত, সাক্ষ্য গ্রহণ এবং বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই মামলা দেশের আইনি ব্যবস্থার জটিলতা এবং কার্যকারিতা উভয়ই তুলে ধরেছে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, প্রতিবেশী এবং সমাজ এখন ধীরে ধীরে ন্যায়ের আলোকে সামনের দিকে এগোচ্ছে।
এই ঘটনাটি আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, অপরাধ কখনোই অপরাজেয় নয়, এবং ন্যায়বিচার অবশেষে প্রতিফলিত হয়। ধানমন্ডির এই হত্যাকাণ্ডের রায় সমাজকে নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং মানবিক দায়বদ্ধতার গুরুত্ব মনে করিয়ে দিচ্ছে।