প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেই রাষ্ট্র পরিচালনার মূল কাঠামো সাজাতে শুরু করেছেন বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শপথ নেওয়ার পরপরই তিনি মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যে দপ্তর বণ্টন সম্পন্ন করেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি দায়িত্ব নিজের কাছে রাখেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জারি করা প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে, তিনি নিজের অধীনে রেখেছেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ। প্রশাসনিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, নতুন সরকারের নীতিনির্ধারণী অগ্রাধিকার বোঝার জন্য এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
মঙ্গলবার রাতে জারি করা সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যে দপ্তর বণ্টন করেছেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো নিজ তত্ত্বাবধানে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সাধারণত নতুন সরকার গঠনের পরপরই মন্ত্রিসভার কাঠামো নির্ধারণ এবং দপ্তর বণ্টন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ধাপ, কারণ এর মাধ্যমেই সরকারের নীতিগত দিকনির্দেশনা ও অগ্রাধিকার স্পষ্ট হয়। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা ও প্রশাসনিক সমন্বয় সংশ্লিষ্ট দপ্তর নিজের হাতে রাখার অর্থ হচ্ছে, তিনি সরকারের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সরাসরি নেতৃত্ব দিতে চান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, একটি মন্ত্রণালয় এবং দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ নিজের কাছে রাখা নতুন প্রধানমন্ত্রীর প্রশাসনিক কৌশলের অংশ। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ দেশের নিরাপত্তা, কৌশলগত পরিকল্পনা ও সামরিক নীতির কেন্দ্রবিন্দু। অন্যদিকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ পুরো সরকারের প্রশাসনিক সমন্বয় ও নীতিনির্ধারণ কার্যক্রমের মূল নিয়ন্ত্রক। ফলে এই তিনটি দপ্তর নিজের হাতে রাখার মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র সরাসরি নিয়ন্ত্রণে রাখছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নতুন সরকার গঠনের পর প্রথম দিন থেকেই সচিবালয় ও প্রশাসনিক দপ্তরগুলোতে কর্মচাঞ্চল্য দেখা গেছে। কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে কাজ করার জন্য তারা প্রস্তুত এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম দ্রুত গতিতে চালু রাখার নির্দেশনা ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে। সচিবালয়ের বিভিন্ন দপ্তরে নামফলক পরিবর্তন, অফিস প্রস্তুতকরণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের মধ্য দিয়ে নতুন প্রশাসনিক অধ্যায়ের সূচনা ঘটেছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পরপরই দ্রুত দপ্তর বণ্টন করা একটি সুসংগঠিত প্রশাসনিক প্রস্তুতির ইঙ্গিত দেয়। অনেক সময় নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দপ্তর বণ্টনে বিলম্ব হলে প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়। কিন্তু এবার সেই ধরনের বিলম্ব দেখা যায়নি। বরং মন্ত্রিসভা গঠন এবং দপ্তর বণ্টন একই ধারাবাহিকতায় সম্পন্ন হওয়ায় প্রশাসনের কার্যক্রমে গতি এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এবারের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। দলটির নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রিসভায় ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী শপথ নিয়েছেন। নতুন মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞ ও নবীন রাজনীতিকদের সমন্বয় ঘটানো হয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক দক্ষতার সমন্বয়ে একটি কার্যকর সরকার গঠনের লক্ষ্যেই এই বিন্যাস করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, নতুন প্রধানমন্ত্রীর জন্য প্রথম দিককার সময়টিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো সরকারের দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রমের ভিত্তি তৈরি করে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা, প্রশাসনিক সমন্বয় ও নীতিনির্ধারণ সংশ্লিষ্ট দপ্তর নিজের হাতে রাখার সিদ্ধান্ত থেকে বোঝা যায় যে তিনি নীতি বাস্তবায়নে সরাসরি তদারকি করতে চান। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া দ্রুত হতে পারে এবং সরকারের নীতিগত অবস্থান স্পষ্টভাবে বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
একই সঙ্গে প্রশাসনের ভেতরে শৃঙ্খলা ও সমন্বয় বজায় রাখাও নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর অধীনে থাকায় সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার হবে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সমন্বয় শক্তিশালী হলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, নীতি প্রণয়ন এবং সংকট মোকাবিলায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়।
নতুন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক যাত্রাপথও আলোচনায় এসেছে। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া-এর পুত্র এবং দীর্ঘদিন ধরে দেশের রাজনীতিতে প্রভাবশালী একটি পরিবারের সদস্য হিসেবে পরিচিত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্যের অভিজ্ঞতা এবং নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের সমন্বয় তার প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হতে পারে।
এদিকে সরকারি কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করছেন, গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর নিজের হাতে রাখার ফলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দ্রুততা আসবে এবং নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা বাড়বে। তবে অন্যদিকে কিছু বিশ্লেষক বলছেন, কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা সবসময় কার্যকর ফল দেয় না; এজন্য সমন্বিত দলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ভবিষ্যতে তিনি কীভাবে মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করেন, সেটিই হবে প্রশাসনিক সাফল্যের অন্যতম সূচক।
নতুন সরকারকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যেও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের এই মুহূর্তে স্থিতিশীলতা বজায় রেখে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং প্রশাসনিক সংস্কারে মনোযোগ দেওয়া জরুরি। প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রিসভার প্রথম সিদ্ধান্তগুলো তাই জনমতের দৃষ্টিতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, নতুন প্রধানমন্ত্রীর হাতে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি দপ্তর রাখার সিদ্ধান্ত কেবল প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি একটি রাজনৈতিক বার্তা। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার মূল কাঠামো নিজ তত্ত্বাবধানে রেখে দ্রুত নীতি বাস্তবায়ন ও প্রশাসনিক সমন্বয় জোরদার করার ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। এখন নজর থাকবে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় এবং নতুন সরকার কত দ্রুত তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এগোতে পারে।