যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তি জনস্বার্থবিরোধী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৩ বার
যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তি জনস্বার্থবিরোধী

প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারি  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বাণিজ্য চুক্তি দেশের জন্য লাভের চেয়ে বেশি ঝুঁকি ও অসুবিধা নিয়ে আসতে পারে বলে তীব্র সতর্কতা জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) আয়োজিত ‘যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি: বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রভাব’ শীর্ষক আলোচনায় এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও গবেষকরা। তারা একমত হয়েছেন যে, চুক্তিটি কেবল বাণিজ্যের সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এতে রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক উপাদানও রয়েছে।

বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা বা সুতা ব্যবহার করে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে যে ‘পাল্টা শুল্ক’ অব্যাহতি দেওয়া হবে বলে প্রচার করা হচ্ছে, তা বহু শর্তযুক্ত। শর্তগুলো মেনে বাংলাদেশ আদৌ সুবিধা পাবে কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। রপ্তানি বাড়লেও তা মোট পোশাক রপ্তানির মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশের বেশি হবে না। উল্টো, এই সুবিধা নিতে গিয়ে বাংলাদেশকে কৃষি, জ্বালানি, অস্ত্রসহ বিপুল পরিমাণ পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে হয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, চুক্তিটি দেশীয় অর্থনৈতিক স্বার্থের বিপরীতে কার্যকর হতে পারে। গবেষণা সংস্থা সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, “চুক্তি জনস্বার্থবিরোধী এবং অন্তর্বর্তী সরকারের এখতিয়ারবহির্ভূত। এটি কেবল বাণিজ্যের সীমায় নেই, বরং এতে ভূরাজনৈতিক দিকও জড়িত। বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ বিবেচনা করা হয়নি, এবং এটি করার আগে কোনো ধরনের জনসম্মেলন বা অংশীজনের মতামত নেওয়া হয়নি।”

গবেষণা সংস্থা সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, “এই চুক্তি বাণিজ্য চুক্তি নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা চুক্তি। বাংলাদেশ যদি তা লঙ্ঘন করে, গত বছরের এপ্রিল মাসে আরোপিত ৩৭ শতাংশ শুল্কের হুমকির মুখোমুখি হতে পারে। এই চুক্তি করা হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষ সময়ে এবং তা ডব্লিউটিওর বিধান লঙ্ঘন করে।”

ট্যারিফ কমিশনের সাবেক সদস্য ড. মোস্তফা আবিদ খান বলেন, “চুক্তি থেকে বের হওয়া সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে কঠোর নীতি আরোপ করা হয়েছে, তা কম্বোডিয়া বা মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলোর চুক্তির তুলনায় কঠোর। নতুন সরকারকে সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিয়ে চুক্তি সংশোধনের উপায় বের করতে হবে।”

গবেষণা সংস্থা র‌্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. আব্দুর রাজ্জাক অনলাইনে আলোচনায় অংশগ্রহণ করে বলেন, চুক্তিটি বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়াবে না, বরং দেশের স্বার্থ বিপন্ন করবে। বাংলাদেশের জন্য যে কৃষি, জ্বালানি, বিমান ও অস্ত্র ক্রয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তার প্রভাব নেতিবাচক হতে পারে। এছাড়া, অন্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্য নীতির লঙ্ঘন হিসেবেও গণ্য হতে পারে।

এছাড়া, এমসিসিআইর সাবেক সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, চুক্তি একটি আইনগত নথি, তাই জোর করে বদলানো যাবে না। তবে কৌশলগতভাবে এবং সমস্ত অংশীজনকে নিয়ে সমঝোতার মাধ্যমে সংশোধন করার চেষ্টা করা সম্ভব। বিশেষ করে চুক্তিতে ‘রুলস অব অরিজিন’-এর ধারা বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করতে সক্ষম হয়নি।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা এও উল্লেখ করেছেন যে, চুক্তিটি এখনও কার্যকর হয়নি। উভয় দেশের সংসদে পাসের পরই তা কার্যকর হবে। সেই আগে বাংলাদেশকে আইনি দিক থেকে সংশোধন করতে হবে এবং প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রে অভিজ্ঞ ‘লবিস্ট’ নিয়োগ করে চুক্তি পর্যালোচনা ও সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তারা সতর্ক করেছেন, পেশাদারিত্ব ও কৌশল প্রয়োগ না করলে চুক্তিটি দেশের জন্য হিতে-বিপরীত হতে পারে।

অতীতে অভিজ্ঞ অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা একটি মিলে সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দিয়েছেন যে, চুক্তিটি শুধুমাত্র বাণিজ্যের চুক্তি নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে তার অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক সুরক্ষা চুক্তি। এই চুক্তির মাধ্যমে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ একটি কমজোর ও দরিদ্র দেশের ওপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধা নিয়েছে। তবে শক্তিশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে জোর করে চুক্তি বদলানো সম্ভব নয়। এজন্য নতুন সরকারকে কৌশলগত ও ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগের মাধ্যমে সংশোধনের পথ বের করতে হবে।

অন্যদিকে, দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায় আশা করছে যে, নতুন সরকার চুক্তিটি পুনর্বিবেচনা করবে, দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থকে রক্ষা করবে এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ ও রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং দেশের আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে সুসংহত করার দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত