প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিতে একগুচ্ছ সামরিক ও কৌশলগত চুক্তিতে সম্মত হয়েছে ভারত ও ফ্রান্স। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে মুম্বাইতে অনুষ্ঠিত দীর্ঘ বৈঠকে দুই দেশ তাদের সম্পর্ককে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিশেষ বৈশ্বিক কৌশলগত অংশীদারিত্বে’ উন্নীত করার ঘোষণা দেয়। এই ঘোষণার মাধ্যমে শুধু সামরিক নয়, প্রযুক্তি, মহাকাশ, প্রতিরক্ষা উৎপাদন ও শিল্প সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে এসে ম্যাক্রোঁর সঙ্গে মোদির এই বৈঠককে কূটনৈতিক মহলে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে মোদি বলেন, ফ্রান্স বহুদিন ধরেই ভারতের অন্যতম নির্ভরযোগ্য কৌশলগত অংশীদার। তিনি উল্লেখ করেন, পারস্পরিক আস্থা, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির ওপর দাঁড়িয়ে এই সম্পর্ক এখন নতুন স্তরে উন্নীত হয়েছে। ম্যাক্রোঁও একই সুরে বলেন, গত কয়েক বছরে দুই দেশের সহযোগিতা বহুমাত্রিকভাবে বিস্তৃত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে তা বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সফর চলাকালে সামরিক ও বেসামরিক মিলিয়ে ২০টিরও বেশি চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো যৌথ উদ্যোগে আধুনিক ‘হ্যামার’ ক্ষেপণাস্ত্র ভারতে নির্মাণের পরিকল্পনা এবং ১১৪টি রাফাল যুদ্ধবিমান ক্রয়ের সিদ্ধান্ত। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই দুটি চুক্তিই দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
এই সফরের সবচেয়ে আলোচিত প্রকল্পগুলোর একটি হলো কর্ণাটকের ভিমাগালে স্থাপিত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন হেলিকপ্টার অ্যাসেম্বলি লাইন উদ্বোধন। কর্ণাটক রাজ্যে নির্মিত এই কারখানাটি যৌথভাবে গড়ে তুলেছে এয়ারবাস ও টাটা গ্রুপ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মোদি জানান, এই উদ্যোগ ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পকে আত্মনির্ভর করার পথে বড় পদক্ষেপ। তিনি বলেন, এখানেই তৈরি হওয়া এইচ-১২৫ হেলিকপ্টার এমন উচ্চতায় উড়তে পারবে, যা বিশ্বের অন্য কোনো হেলিকপ্টারের পক্ষে সম্ভব নয়— এমনকি মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতাতেও এটি কার্যকরভাবে কাজ করতে সক্ষম।
ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং জানিয়েছেন, এই কারখানায় প্রায় এক হাজার কোটি রুপি বিনিয়োগ হবে এবং এতে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তিনি আরও বলেন, এটি শুধু সামরিক প্রয়োজন মেটাবে না, বেসামরিক খাতেও হালকা ও বহুমুখী হেলিকপ্টারের বাজার তৈরি করবে। ভারতের প্রথম বেসরকারি হেলিকপ্টার অ্যাসেম্বলি লাইন হিসেবে প্রকল্পটি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
যৌথ সামরিক সহযোগিতার আরেকটি বড় দিক হলো ‘হ্যামার’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প। আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য এই ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরের সুরক্ষিত লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে পারে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা বা শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভেতরে থাকা লক্ষ্যবস্তুকেও এটি ধ্বংস করতে সক্ষম বলে সামরিক সূত্রের দাবি। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত ভারত ইলেক্ট্রনিক্স লিমিটেড এবং ফ্রান্সের সাফরান ইলেক্ট্রনিক্স অ্যান্ড ডিফেন্স যৌথ উদ্যোগে একটি নতুন সংস্থা গঠন করেছে, যেখানে উভয় পক্ষের সমান শেয়ার থাকবে।
এই ক্ষেপণাস্ত্রের গুরুত্ব নিয়ে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এটি ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে। বিশেষ করে পাহাড়ি সীমান্ত এলাকায় যেখানে লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুল আঘাত হানা কঠিন, সেখানে এ ধরনের অস্ত্র কার্যকর হতে পারে। অতীতে সীমান্ত উত্তেজনার সময় জরুরি ভিত্তিতে এই ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহ করেছিল ভারত, যা তার কৌশলগত গুরুত্বকে স্পষ্ট করে।
ফরাসি প্রেসিডেন্টের সফরের ঠিক আগেই ভারতের প্রতিরক্ষা ক্রয় পরিষদ ১১৪টি রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার সিদ্ধান্ত অনুমোদন দেয়। কয়েক দশকের মধ্যে এটিই ভারতের সবচেয়ে বড় যুদ্ধবিমান ক্রয় বলে জানা গেছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এর মধ্যে কিছু বিমান সরাসরি ফ্রান্স থেকে আনা হবে এবং বাকিগুলো দেশেই উৎপাদন করা হবে। এই উদ্যোগ ভারতের ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যার লক্ষ্য প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো।
ভারতের বিমানবাহিনী, অর্থাৎ ইন্ডিয়ান এয়ার ফোর্স, দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধবিমানের স্কোয়াড্রন ঘাটতির মুখে রয়েছে। পুরোনো বহর ধাপে ধাপে অবসর নেওয়ায় নতুন যুদ্ধবিমান সংগ্রহ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন রাফালগুলো যুক্ত হলে ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ হবে।
মুম্বাইয়ের বৈঠকের যৌথ ঘোষণায় আরও বলা হয়েছে, প্রতিরক্ষা ছাড়াও মহাকাশ গবেষণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা ও জলবায়ু প্রযুক্তিতে সহযোগিতা বাড়ানো হবে। সফরের পরবর্তী কর্মসূচিতে ম্যাক্রোঁর নয়াদিল্লি সফর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যেখানে তিনি একটি আন্তর্জাতিক এআই সম্মেলনে অংশ নেবেন এবং আরও কয়েকটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তিগুলো শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নয়, বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ছে। মোদি উল্লেখ করেছেন, ২০২৬ সাল ভারত ও ইউরোপের সম্পর্কের ক্ষেত্রে মোড় ঘোরানো সময় হতে পারে, বিশেষ করে সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়ন–এর সঙ্গে ভারতের একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি হওয়ায় দুই অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন গতি পেয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভারত ও ফ্রান্স উভয় দেশই বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে এবং তারা প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও শিল্প সহযোগিতার মাধ্যমে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ আরও শক্তিশালী করতে চায়। এই অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ভারত উন্নত প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন করবে, আর ফ্রান্স পাবে একটি বৃহৎ বাজার ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা অংশীদার।
সব মিলিয়ে ম্যাক্রোঁর এই সফর শুধু আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সফর নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত কৌশলগত উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়, যৌথ উৎপাদন, প্রযুক্তি বিনিময় এবং শিল্প বিনিয়োগ— সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।