রমজান-গরমে বিদ্যুৎই বড় চ্যালেঞ্জ: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১৪ বার
রমজান গরম বিদ্যুৎ চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশ

প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রমজান মাস ও আসন্ন তীব্র গরমের মৌসুম সামনে রেখে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাই সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মন্তব্য করেছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই বাংলাদেশ সচিবালয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি জনগণের জীবনযাত্রা, শিল্প উৎপাদন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি জড়িত একটি জাতীয় অগ্রাধিকার।

মন্ত্রী জানান, রমজান মাসে বিদ্যুতের চাহিদা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেড়ে যায়, বিশেষ করে সেহরি ও ইফতারের সময়। অন্যদিকে মার্চ থেকে শুরু হওয়া গরমের মৌসুমে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, ফ্যান ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। এই দুই পরিস্থিতি একসঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। তাই আগাম পরিকল্পনা, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো এখন সরকারের প্রধান লক্ষ্য বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, সরকার ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তর পর্যালোচনা শুরু করেছে। কোথায় ঘাটতি রয়েছে, কোন বিদ্যুৎ কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে না এবং কোথায় জ্বালানির ঘাটতির সম্ভাবনা আছে— এসব বিষয়ে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তার ভাষায়, “সমস্যা আগে শনাক্ত করা গেলে সমাধানও দ্রুত করা যায়। আমরা সেই নীতিতেই এগোচ্ছি।”

ব্রিফিংয়ে তিনি বিদ্যুৎ খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি প্রতিরোধের বিষয়টিকেও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন। মন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ খাতে অনিয়ম বা দুর্নীতির কোনো সুযোগ রাখা হবে না। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ— প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নজরদারি জোরদার করা হবে। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, যেসব কর্মকর্তা বা কর্মচারী দায়িত্ব পালনে অবহেলা করবেন কিংবা অনিয়মে জড়াবেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সরকারের এই অবস্থানকে বিশেষজ্ঞরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতি বা অপচয় কমানো গেলে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়াও বিদ্যমান সম্পদ থেকেই অধিক কার্যকারিতা অর্জন সম্ভব। তারা মনে করেন, বিদ্যুৎ খাতের সংস্কার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে ভোক্তারা স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সুবিধা পাবে।

মন্ত্রী আরও বলেন, বিদ্যুৎ পরিস্থিতি উন্নত করতে সরকার শুধু উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে না, পাশাপাশি চাহিদা ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, জনগণকে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমে এবং চাপ হ্রাস পায়। একই সঙ্গে শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতেও বিদ্যুৎ ব্যবহারে দক্ষতা বাড়াতে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হবে।

তিনি উল্লেখ করেন, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। স্মার্ট গ্রিড, ডিজিটাল মনিটরিং এবং স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মতো আধুনিক প্রযুক্তি ধীরে ধীরে যুক্ত করা হচ্ছে, যাতে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে দ্রুত তা শনাক্ত ও সমাধান করা যায়। তার মতে, আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ ছাড়া বিদ্যুৎ খাতে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ ঘাটতি বা লোডশেডিংয়ের মতো পরিস্থিতি এড়াতে সরকার ইতোমধ্যে বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করছে। প্রয়োজনে অতিরিক্ত জ্বালানি আমদানি, জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু করা কিংবা উৎপাদন বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, “জনগণ যেন কোনোভাবেই ভোগান্তিতে না পড়ে, সেটাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।”

দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ শুধু নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয় নয়, এটি শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি এবং বিনিয়োগের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বিদ্যুৎ সংকট হলে শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যাহত হয়, যার প্রভাব পড়ে জাতীয় অর্থনীতিতে। তাই বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার অন্যতম শর্ত।

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ চাহিদা প্রতিবছরই বাড়ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, নগরায়ণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রার কারণে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। ফলে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও সঠিক পরিকল্পনাই বিদ্যুৎ খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে।

ব্রিফিং শেষে মন্ত্রী সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে তাৎক্ষণিক কর্মপরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সক্রিয় ভূমিকা ছাড়া কোনো পরিকল্পনাই সফল হবে না। তাই কেন্দ্র থেকে জেলা পর্যায় পর্যন্ত সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জনগণ বিদ্যুৎ সেবাকে এখন মৌলিক নাগরিক সুবিধার অংশ হিসেবে দেখে। তাই সরকারও এ খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, সঠিক পরিকল্পনা ও কঠোর তদারকির মাধ্যমে আসন্ন রমজান ও গরমের সময় বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।

সব মিলিয়ে নতুন দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। তার বক্তব্যে যেমন চ্যালেঞ্জের বাস্তবতা উঠে এসেছে, তেমনি রয়েছে তা মোকাবিলার পরিকল্পনার ইঙ্গিত। এখন দেখার বিষয়, ঘোষিত উদ্যোগগুলো কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয় এবং আসন্ন মৌসুমে জনগণ কতটা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা পায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত