প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের অর্থনীতিকে সবার জন্য সমান সুযোগের ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করে নতুন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, পৃষ্ঠপোষকতার ভিত্তিতে পরিচালিত অর্থনৈতিক কাঠামো আর চলতে দেওয়া হবে না। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে সমান সুযোগ তৈরি করাই হবে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। বুধবার রাজধানীর বাংলাদেশ সচিবালয়ে অবস্থিত অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রথম কর্মদিবসে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন।
দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই অর্থমন্ত্রী দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর মৌলিক সমস্যা তুলে ধরে বলেন, বর্তমানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকগুলোই কার্যকারিতা হারিয়েছে বা দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। তার মতে, শক্তিশালী ও দক্ষ প্রতিষ্ঠান ছাড়া কোনো অর্থনৈতিক কর্মসূচি দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে এবং সেখানে পেশাদারিত্ব, দক্ষতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এসব উপাদান অনুপস্থিত থাকলে বড় বড় উন্নয়ন পরিকল্পনাও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
অর্থমন্ত্রী মনে করেন, দেশের অর্থনীতিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার জন্য কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। তিনি বলেন, অর্থনীতি এমন হতে হবে যাতে প্রতিটি নাগরিক সমানভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে এবং উন্নয়নের সুফল সমাজের সব স্তরে পৌঁছায়। তার ভাষায়, অর্থনৈতিক উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেটি কেবল নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে সীমাবদ্ধ না থেকে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত করে। তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য এমন এক অর্থনীতি গড়া, যেখানে সুযোগের সমতা থাকবে এবং সবাই নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অবদান রাখতে পারবে।”
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ও জটিল বিধিনিষেধ ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এই পরিস্থিতি কাটাতে সরকারকে ‘সিরিয়াস ডিরেগুলেশন’ বা অপ্রয়োজনীয় নিয়ম শিথিল করার পথে হাঁটতে হবে। তার মতে, একটি অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত প্রতিযোগিতা কমিয়ে দেয় এবং পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি তৈরি করে। তাই প্রয়োজন এমন একটি নীতি কাঠামো, যা উদ্যোক্তাদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করবে এবং বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা বজায় রাখবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে দেশের অর্থনৈতিক নীতির সম্ভাব্য দিকনির্দেশনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার ও বাজার ব্যবস্থার উদারীকরণ নিয়ে তার জোরালো অবস্থান ভবিষ্যতে নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। তারা মনে করেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বাড়ানো গেলে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থনীতিকে কার্যকর ও টেকসই করতে হলে শুধু নীতি ঘোষণাই যথেষ্ট নয়, বাস্তবায়নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি উল্লেখ করেন, অতীতে অনেক ভালো পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলেও বাস্তবায়নের দুর্বলতার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। তাই এবার পরিকল্পনার পাশাপাশি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে জনগণ সরকারের কার্যক্রমের ওপর আস্থা রাখতে পারে।
তিনি আরও জানান, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে প্রশাসনিক জটিলতা কমানো হবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া দ্রুত করা হবে। এতে দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা উৎসাহিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তার মতে, বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং অর্থনীতির গতিশীলতা বাড়বে, যা সামগ্রিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে।
অর্থমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, অর্থনৈতিক ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হলে স্বচ্ছতা অপরিহার্য। সরকারি ব্যয়, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও আর্থিক লেনদেনের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হলে দুর্নীতি কমবে এবং জনগণের আস্থা বাড়বে। তিনি জানান, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ব্যবহার করে আর্থিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হবে, যাতে অনিয়মের সুযোগ কমে যায়।
তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে সংস্কার অনিবার্য। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে এবং প্রযুক্তির প্রভাব অর্থনৈতিক কাঠামোকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে সময়োপযোগী নীতি গ্রহণ না করলে অর্থনীতি পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। তাই তিনি সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানান, জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করার।
অর্থমন্ত্রী তার বক্তব্যে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জনগণ এখন অর্থনৈতিক নীতির বাস্তব সুফল দেখতে চায়— যেমন কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন। তাই সরকারের সব অর্থনৈতিক পদক্ষেপ এমনভাবে নেওয়া হবে যাতে নাগরিকরা সরাসরি তার ফলাফল অনুভব করতে পারে। তার মতে, উন্নয়ন তখনই সফল, যখন তা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে বর্তমানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার পাশাপাশি কাঠামোগত সংস্কার একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি মূল্য ওঠানামা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তার মধ্যেও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে শক্তিশালী নীতি ও কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামো প্রয়োজন। নতুন অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য সেই প্রয়োজনীয়তার প্রতিফলন বলেই মনে করছেন তারা।
দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই অর্থমন্ত্রী যে দৃঢ় বার্তা দিয়েছেন, তা থেকে বোঝা যাচ্ছে তিনি অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের দিকে নজর দিতে চান। পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতি বন্ধ করা, সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর মতো লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এখন নজর থাকবে ঘোষিত লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নে সরকার কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে এবং তা সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।