এলডিসি উত্তরণ পেছাতে উদ্যোগ: বাণিজ্যমন্ত্রী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৩ বার
এলডিসি উত্তরণ পেছানোর উদ্যোগ বাংলাদেশ

প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণের নির্ধারিত সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর। তিনি বলেছেন, দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা, রপ্তানি কাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং বিনিয়োগ পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার এই সময়সীমা স্থগিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। বুধবার রাজধানীর বাংলাদেশ সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, বিষয়টি ইতোমধ্যেই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে।

মন্ত্রী বলেন, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন স্থগিত করার বিষয়ে সরকার নীতিগতভাবে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। এ লক্ষ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছে এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ-এর সঙ্গে সমন্বয় করে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো হবে। তিনি জানান, প্রথম সপ্তাহেই আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানোর বাধ্যবাধকতা না থাকলেও সরকার সময়ক্ষেপণ না করে শুরু থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছে। তার ভাষায়, দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় যা করা প্রয়োজন, সরকার তা করবে।

বাণিজ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেন, ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। কারণ এলডিসি মর্যাদা হারালে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যে বিশেষ সুবিধাগুলো পাওয়া যায়, সেগুলো ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে। বিশেষ করে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা, সহজ শর্তে ঋণ এবং উন্নয়ন সহযোগিতার মতো সুযোগ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। তাই শিল্প ও রপ্তানিমুখী খাতের উদ্যোক্তারা মনে করছেন, সময়সীমা কিছুটা বাড়ানো গেলে দেশের প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ বাড়বে।

রপ্তানি পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮৫ শতাংশ একটি মাত্র পণ্যের ওপর নির্ভরশীল, যা অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি ইঙ্গিত দেন যে তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দেশের রপ্তানি কাঠামোকে সংকীর্ণ করে রেখেছে। এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে নতুন পণ্য যুক্ত করা, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প গড়ে তোলা এবং নতুন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করা জরুরি। তিনি জানান, সরকার বেসরকারি খাতকে সহায়তা দিয়ে রপ্তানি বহুমুখীকরণে বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করবে।

রমজান মাস ঘিরে বাজার পরিস্থিতি নিয়েও সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ সরকারের হাতে রয়েছে এবং আমদানির পাইপলাইনেও যথেষ্ট সরবরাহ রয়েছে। তাই বাজার নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। তিনি ব্যাখ্যা করেন, রমজানের শুরুতে কিছু পণ্যের দাম সাময়িক বাড়তে পারে, কারণ অনেক পরিবার পুরো মাসের বাজার একসঙ্গে করে থাকে। এতে চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায় এবং খুচরা বাজারে মূল্যচাপ তৈরি হয়। তবে এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হয় না বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন।

বিনিয়োগ পরিস্থিতি প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, অনিশ্চয়তা থাকলে কোনো বিনিয়োগ আসে না। বিনিয়োগকারীরা তখনই নতুন প্রকল্পে অর্থ বিনিয়োগ করেন, যখন তারা নিশ্চিত হন যে ব্যবসার পরিবেশ স্থিতিশীল এবং নীতিগত ঝুঁকি কম। তাই বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সরকার স্থিতিশীল নীতি, সহজ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং নিরাপদ ব্যবসা পরিবেশ নিশ্চিত করার দিকে জোর দেবে। তিনি বলেন, দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে প্রয়োজন হলে নীতিগত সংস্কারও করা হবে।

তিনি আরও বলেন, দেশের বড় একটি কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী রয়েছে এবং প্রতিবছর প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। কিন্তু গত কয়েক বছরে বিনিয়োগ স্থবির থাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমেছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অর্থনীতিতে চাপ বাড়তে পারে। তাই দ্রুত বিনিয়োগ বাড়ানো এবং শিল্প সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা সরকারের অগ্রাধিকার।

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। কারণ এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উত্তরণ সাধারণত একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হলেও প্রস্তুতি ছাড়া এই পরিবর্তন হলে শিল্প ও বাণিজ্য খাতে চাপ তৈরি হতে পারে। তাই অনেক দেশই প্রয়োজন হলে উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর চেষ্টা করে থাকে, যাতে অর্থনৈতিক কাঠামো শক্তিশালী করার জন্য অতিরিক্ত সময় পাওয়া যায়।

মন্ত্রী বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই রমজান মাস শুরু হওয়া একটি বড় পরীক্ষা। মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে সরকারকে বাজার নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সফল হতে হবে। তিনি বলেন, জনগণের আস্থা অর্জনই সরকারের প্রধান লক্ষ্য এবং সে লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

এ সময় বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। পরে বাণিজ্যমন্ত্রী মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও দপ্তর প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং চলমান নীতি ও কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে রয়েছে যেখানে একদিকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রয়োজন রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা পেছানোর উদ্যোগকে তারা বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন, যদি তা দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষায় সহায়ক হয়।

সব মিলিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে দেশের অর্থনৈতিক কৌশলের একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা ফুটে উঠেছে। তিনি যেমন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী করার কথা বলেছেন, তেমনি অভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীল রাখা ও বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এখন দৃষ্টি থাকবে সরকারের এই পরিকল্পনা বাস্তবে কত দ্রুত রূপ পায় এবং তা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত