প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে সময়োপযোগী ও বাস্তবমুখী করে তুলতে কারিকুলাম পুনর্বিবেচনার ওপর জোর দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। বুধবার বাংলাদেশ সচিবালয়-এ নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি বলেন, শিক্ষার উন্নয়নে কেবল ধাপে ধাপে অগ্রগতি নয়, বরং ধারাবাহিক ও বহুমাত্রিক গতিতে এগোতে হবে। তাঁর ভাষায়, শিক্ষাক্ষেত্রে ‘হাই জাম্প’ নয়, ‘মোর মোর জাম্প’ দরকার—অর্থাৎ একক কোনো বড় পরিবর্তনের বদলে ধারাবাহিক উন্নয়নের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে।
দুপুরের দিকে সচিবালয়ে পৌঁছালে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ফুল দিয়ে নবনিযুক্ত শিক্ষামন্ত্রীকে স্বাগত জানান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের পরপরই শুরু হয় সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়, যেখানে দেশের শিক্ষা কাঠামোর বর্তমান চ্যালেঞ্জ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং সংস্কারের দিকনির্দেশনা নিয়ে কথা বলেন মন্ত্রী।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, দেশের বিদ্যমান কারিকুলামকে বর্তমান বিশ্বের চাহিদা অনুযায়ী পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি। তাঁর মতে, প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শিক্ষার্থীদের কেবল পরীক্ষাভিত্তিক জ্ঞান নয়, বরং সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, উদ্ভাবনী দক্ষতা ও বাস্তব সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। তিনি বলেন, এমন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবক হিসেবেও গড়ে উঠবে।
মন্ত্রী আরও জানান, শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পাঠ্যপুস্তক উন্নয়ন, প্রযুক্তি সংযোজন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। তিনি বলেন, শিক্ষার উন্নয়ন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যার জন্য ধারাবাহিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন অপরিহার্য। তাই হঠাৎ বড় ধরনের সংস্কার না এনে ধাপে ধাপে পরিবর্তনের মাধ্যমে টেকসই অগ্রগতি নিশ্চিত করতে চান তিনি।
তিনি উল্লেখ করেন, শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন ধারণা ও উদ্ভাবন গ্রহণের ক্ষেত্রে ইতিবাচক মানসিকতা তৈরি করতে হবে। কারণ পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারলে শিক্ষাব্যবস্থা পিছিয়ে পড়ে। তাঁর মতে, শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা নয়; বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য দক্ষ, সচেতন ও মানবিক নাগরিক তৈরি করা।
মতবিনিময় অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, দেশের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সহযোগিতা নিয়ে তিনি কাজ করতে চান এবং এ প্রসঙ্গে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর প্রতি আস্থা প্রকাশ করেন। তাঁর ভাষায়, প্রধানমন্ত্রী শিক্ষাবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করেন এবং শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে দেখেন। তাই সরকারের সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে শিক্ষা সংস্কার কার্যক্রমকে সমন্বিত করা হবে।
শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজও একই অনুষ্ঠানে বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের মূল ভিত্তি হচ্ছে শিক্ষার মানোন্নয়ন। তিনি জানান, শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে নতুন করে কাঠামোগত উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে পরিকল্পিত পরিবর্তন আনতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানের জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে পারে। তাঁর মতে, দক্ষ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি কার্যকর দল গঠন করে শিক্ষা সংস্কারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।
শিক্ষাবিদদের মতে, বর্তমান বিশ্বে শিক্ষাব্যবস্থার রূপান্তর একটি বৈশ্বিক প্রবণতা। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যভিত্তিক অর্থনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজাতে হচ্ছে। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার কারিকুলাম ও পাঠদান পদ্ধতি আধুনিকায়নের উদ্যোগকে তারা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, শুধু পাঠ্যসূচি পরিবর্তন করলেই হবে না; শিক্ষাদান পদ্ধতি, মূল্যায়ন ব্যবস্থা ও শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন।
শিক্ষা বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতে বিভিন্ন সময়ে কারিকুলাম সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা দেখা গেছে। শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত ঘাটতি, প্রযুক্তির অপর্যাপ্ত ব্যবহার এবং প্রশাসনিক জটিলতা এসব সমস্যার অন্যতম কারণ। তাই নতুন উদ্যোগ সফল করতে হলে নীতিনির্ধারণের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষাক্ষেত্রে টেকসই পরিবর্তন আনতে হলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় জরুরি। পাশাপাশি শিক্ষাকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব। এ ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা ও জবাবদিহিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
শিক্ষামন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে মানবিক শিক্ষার গুরুত্বও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রযুক্তি ও দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়িত্ববোধ শিক্ষার্থীদের মধ্যে গড়ে তুলতে হবে। কারণ উন্নত সমাজ গঠনের জন্য কেবল দক্ষ জনশক্তি নয়, মানবিক ও সচেতন নাগরিকও দরকার। তিনি বিশ্বাস করেন, সঠিক পরিকল্পনা ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে পারবে।
বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে যে ধারাবাহিক সংস্কারের কথা বলা হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে দেশের শিক্ষা কাঠামোতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রসার, গবেষণাভিত্তিক পাঠ্যক্রম এবং দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ চালু করা গেলে শিক্ষার্থীরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, নতুন নেতৃত্বের অধীনে শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবে রূপ দিতে হলে সুপরিকল্পিত কর্মসূচি ও কার্যকর বাস্তবায়ন অপরিহার্য। শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষিত লক্ষ্য অনুযায়ী কারিকুলাম রিভিউ এবং কাঠামোগত সংস্কার সফল হলে দেশের শিক্ষা খাত শুধু জাতীয় উন্নয়নেই নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।