প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সহিংসতার এক বছর পূর্তির প্রাক্কালে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। রাতের অন্ধকারে উপাচার্যের বাসভবন অবরুদ্ধের অভিযোগ ও তাঁকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে ব্যানার টানানোর ঘটনার পর এবার ভাঙচুর করা হয়েছে আলোচিত ‘রক্তাক্ত কুয়েট কর্নার’। সাম্প্রতিক এসব ঘটনার সঙ্গে ছাত্র রাজনীতির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে, যা ঘিরে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ক্যাম্পাসে সংঘটিত সহিংসতা ছিল সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। সেদিন ছাত্র রাজনীতির পক্ষে ও বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং তা দ্রুত সংঘর্ষে রূপ নেয়। অভিযোগ ওঠে, বহিরাগত অস্ত্রধারীদের নিয়ে হামলা চালানো হয়, যাতে শতাধিক শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য আহত হন। সেই ঘটনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দীর্ঘ সময়ের জন্য ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। তদন্ত শেষে প্রশাসন ৩৭ জনকে অভিযুক্ত করে ৩২ জনকে সতর্কবার্তা এবং পাঁচজনকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেয়।
এই বিভীষিকাময় ঘটনার বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আহত শিক্ষার্থীদের একটি অংশ স্মৃতিচারণমূলক প্রদর্শনী আয়োজনের উদ্যোগ নেয়। কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে মঙ্গলবার রাতে ছাত্রকল্যাণ দপ্তরের প্রদর্শনী কক্ষে আলোকচিত্র, তদন্ত প্রতিবেদন ও সংবাদপত্রের কাটিং দিয়ে ‘রক্তাক্ত কুয়েট কর্নার’ সাজানো হয়। আয়োজকদের দাবি, এটি ছিল সহিংসতার শিকারদের স্মরণ এবং সহিংসতা বিরোধী বার্তা দেওয়ার একটি শান্তিপূর্ণ উদ্যোগ। কিন্তু রাত সোয়া বারোটার দিকে আয়োজকরা কাজ শেষ করে চলে যাওয়ার পর ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল সেখানে প্রবেশ করে প্রদর্শনীর উপকরণ ভাঙচুর করে বলে অভিযোগ ওঠে।
একজন প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থী জানান, প্রদর্শনী প্রস্তুতির সময়ই কয়েকজন এসে স্থানটি পর্যবেক্ষণ করে যায়। পরে তারা বেরিয়ে গেলে ওই দলটি ঢুকে পড়ে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, রাত ১২টা ৩২ মিনিটে কয়েকজন যুবক কর্নারে প্রবেশ করে এবং পাঁচ মিনিট পর বের হয়ে যায়। যদিও প্রদর্শনী কক্ষের ভেতরে ক্যামেরা না থাকায় ভাঙচুরের মুহূর্ত সরাসরি ধারণ করা যায়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক ড. বি এম ইকরামুল হক বলেন, কিছুদিন ধরেই একটি গোষ্ঠী ক্যাম্পাসকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে বলে প্রশাসনের কাছে তথ্য রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক দিন আগে যারা উপাচার্যের বাসভবনে গিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিল, একই ব্যক্তিদের এই ঘটনাতেও দেখা গেছে। তিনি বলেন, অতীতে যে ‘গেস্ট রুম সংস্কৃতি’ নিয়ে অভিযোগ ছিল, সেটি আবার ফিরে আসার ইঙ্গিত মিলছে। শিক্ষার্থীরা গত বছরের ঘটনার ট্রমা কাটিয়ে স্বাভাবিক শিক্ষাজীবনে ফিরতে শুরু করেছিল, কিন্তু নতুন করে এমন ঘটনা তাদের মানসিক অবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি জরুরি বৈঠক ডেকেছেন এবং সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্টদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে বলে জানান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মাকসুদ হেলালি বলেন, কিছু শিক্ষার্থী তাঁর কাছে একটি কর্মসূচির কথা মৌখিকভাবে জানিয়েছিল, তবে পরবর্তীতে সেখানে কী ঘটেছে সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত অবগত নন। প্রশাসন ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অভিযোগের তীর যে ছাত্র সংগঠনের দিকে উঠেছে, সেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল-এর এক নেতা সাফওয়ান আহমেদ ইফাজ নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, প্রদর্শনী কর্নারটি দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট ছাত্র সংগঠন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা সেটি মুক্ত করেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ক্যাম্পাসের পরিবেশ বর্তমানে শান্তিপূর্ণ এবং কোনো সংগঠিত ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেনি। তবে প্রশাসনের দাবি, ফুটেজে তাঁকে নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে এবং বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক বিভাজন দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনার অন্যতম কারণ। অতীতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির-সহ বিভিন্ন সংগঠনের দ্বন্দ্ব ও প্রভাব বিস্তার নিয়ে নানা সময়ে সংঘাতের খবর এসেছে। ফলে শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক সহিংসতার ইতিহাস নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ এগুলো বর্ষপূর্তির মতো সংবেদনশীল সময়ে ঘটছে এবং পুরোনো ক্ষত আবার উন্মুক্ত করছে।
ক্যাম্পাসের সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অধিকাংশই রাজনৈতিক সংঘাতমুক্ত শিক্ষার পরিবেশ চান। একজন তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী বলেন, “আমরা পড়াশোনা করতে এসেছি, রাজনীতি করতে নয়। প্রতি বছর যদি এমন ঘটনা ঘটে, তাহলে স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন ব্যাহত হবে।” আরেকজন শিক্ষার্থী বলেন, সহিংসতার স্মৃতি এখনো অনেকের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং নতুন করে উত্তেজনা ছড়ালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, সহিংস ঘটনার স্মৃতি শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যারা সরাসরি সংঘর্ষের শিকার হয়েছে, তাদের মধ্যে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেসের লক্ষণ দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই প্রশাসনের পাশাপাশি শিক্ষক, অভিভাবক ও সহপাঠীদেরও সহানুভূতিশীল ভূমিকা রাখা জরুরি।
স্থানীয় প্রশাসনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নিরাপত্তা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা কঠোরভাবে দমন করা হবে। তাঁর মতে, শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা শুধু শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত করে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলে।
সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দেখা যাচ্ছে, বর্ষপূর্তিকে ঘিরে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাগুলো কুয়েট ক্যাম্পাসে নতুন করে অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রশাসনের তদন্ত ও পদক্ষেপের ওপর এখন সবার দৃষ্টি। শিক্ষার্থীরা আশা করছেন, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে উত্তেজনা প্রশমিত হবে এবং তারা স্বাভাবিক শিক্ষাজীবনে ফিরে যেতে পারবেন। অন্যদিকে অভিভাবক ও সচেতন মহল মনে করছেন, স্থায়ী সমাধানের জন্য শিক্ষাঙ্গনে সহিংস রাজনীতির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার বিকল্প নেই।