প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে দেশে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সময়সীমায় মোট ৫৫৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৮৭ জন নিহত হয়েছেন এবং ১,১৯৪ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া জানুয়ারিতেই চারটি নৌ দুর্ঘটনায় ছয়জনের মৃত্যু এবং সাতজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। রেলপথেও ৪১টি দুর্ঘটনায় ৩২ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং ১৭ জন আহত হয়েছেন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, এই প্রতিবেদনের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে নয়টি জাতীয় দৈনিক, সাতটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং সংস্থার নিজস্ব ডেটার ভিত্তিতে। সংস্থার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। জানুয়ারিতে মোট ২০৮টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৯৬ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের প্রায় ৪০ শতাংশ।
অঞ্চলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকা বিভাগের সড়ক দুর্ঘটনা সবচেয়ে বেশি, যেখানে ১৪৩টি দুর্ঘটনায় ১১৯ জন নিহত হয়েছেন। এটি মোট দুর্ঘটনার ২৫.৫৮ শতাংশ এবং প্রাণহানির হার ২৪.৪৩ শতাংশ। অপরদিকে, সিলেট বিভাগে সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ঘটেছে। সেখানে জানুয়ারিতে ২৪টি দুর্ঘটনায় ১৮ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট দুর্ঘটনার ৪.২৯ শতাংশ এবং মোট নিহতের ৩.৫৯ শতাংশ।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, রাজধানী এবং বৃহত্তর শহরাঞ্চলে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারি পদক্ষেপ তৎক্ষণাৎ প্রয়োজন। ফাউন্ডেশনের মুখপাত্র বলেন, “প্রতি বছর এই ধরনের দুর্ঘটনার হার ক্রমশ বাড়ছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকদের সঠিক প্রশিক্ষণ এবং ট্রাফিক আইন মানার অভাব প্রধান কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি, সড়কের অবস্থা, যানবাহনের অপ্রতুল মান ও অব্যবস্থাপনা এসব দুর্ঘটনার মূল উৎস।”
সংস্থার প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, দুর্ঘটনার সময়কাল ও স্থান অনুযায়ী সঠিক তথ্য বিশ্লেষণ করে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা এবং রংপুরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় যানজট ও অযত্ন সড়কের কারণে দুর্ঘটনা বেশি হচ্ছে। এতে দুর্ঘটনায় আহত ও নিহতের সংখ্যা অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বেশি।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন সুপারিশ করেছে, সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন জরুরি পদক্ষেপ নিক। দুর্ঘটনা কমানোর জন্য ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা, পথচারী ও মোটরসাইকেল চালকদের জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধি, সড়ক চিহ্ন ও লাইটিং উন্নত করা এবং জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা সব সড়কে নিশ্চিত করা জরুরি। সংস্থার অভিমত অনুযায়ী, যদি এসব ব্যবস্থা অবিলম্বে নেয়া না হয়, তবে ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশু, বৃদ্ধ এবং পথচারীরাও এই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা শিশু ও যুবসমাজের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। ফাউন্ডেশন অভিমত দিয়েছে, জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা ও নিরাপদ চালনের অভ্যাস গড়ে তুললে এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
একই সঙ্গে প্রতিবেদনটি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, যাতে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সড়ক, রেল ও নৌপথের নীতিমালা একত্রে প্রয়োগ করা হয়। শুধুমাত্র আইন প্রয়োগ বা সচেতনতা প্রচার যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সড়ক পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তার মধ্যে সমন্বয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্ঘটনার পর প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থা ও দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম প্রাণহানি হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
জানুয়ারির এই দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান থেকে পরিস্কার হয়ে গেছে যে, দেশব্যাপী সড়ক নিরাপত্তা নীতিমালা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের যেসব সড়ক ক্ষয়প্রাপ্ত, সংকীর্ণ ও যানজটপূর্ণ, সেগুলোতে অতি দ্রুত সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা উচিত। একই সঙ্গে সচেতন চালক, সঠিক যানবাহন ও নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রাণহানি কমানো সম্ভব।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন এই প্রতিবেদনে দেশবাসীকে সতর্ক করে দিয়েছে, শুধু দুর্ঘটনার পর জরুরি ব্যবস্থা নয়, দুর্ঘটনা ঘটার আগে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিতেই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিহিত। সংস্থার বক্তব্য, “জনগণকে সচেতন করা, আইন কঠোর করা এবং অবকাঠামো উন্নয়ন করলে আমরা ভবিষ্যতে লাখ লাখ জীবন রক্ষা করতে পারব।”