প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের সামরিক হামলায় নিহতের সংখ্যা ৭৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এই তথ্য বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেটে প্রকাশিত সাম্প্রতিক গবেষণায় নিশ্চিত হয়েছে। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে গাজার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পরিসংখ্যানের চেয়ে এই সংখ্যা অনেক বেশি। ল্যানসেটের ‘গাজা মরটালিটি সার্ভে’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারির মধ্যে গাজায় সহিংস ঘটনার কারণে মোট ৭৫ হাজার ২০০ জন মারা গেছেন। এটি যুদ্ধ শুরুর আগে গাজার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আগের সরকারি পরিসংখ্যান জানিয়েছিল, ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৭২ হাজার ৬৩ জন। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও ৬০৩ জন নিহত হয়েছেন। হামাসের নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বহুবার আন্তর্জাতিক নজরদারি থেকে বাকি তথ্য প্রকাশে সর্তক থেকেছে। তবে ল্যানসেটের এই স্বাধীন গবেষণা নিহতের প্রকৃত সংখ্যা ও সহিংসতার প্রকৃতি স্পষ্ট করেছে।
ইসরায়েল বারবার গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, যুদ্ধের সময় গাজায় নিহতের সংখ্যা কম বলা হচ্ছে। জানুয়ারিতে এক ইসরায়েলি সেনা কর্মকর্তা স্বীকার করেছিলেন, গাজায় প্রায় ৭০ হাজার মানুষ মারা গেছেন। তবে ল্যানসেটের গবেষণা এ সংখ্যা আরও উর্ধ্বমুখী প্রমাণ করছে।
গাজার স্থানীয় অবকাঠামো, হাসপাতাল ও জরুরি সেবা ব্যবস্থা হামলার ফলে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, শান্তিপূর্ণ নাগরিক এবং অসামরিক নাগরিকেরা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য অনেকেই সঠিক সহায়তা পাননি, এবং শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের মধ্যে মৃত্যু ও আহতের সংখ্যা অত্যন্ত বেশি। ল্যানসেটের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এ ধরনের সহিংসতা মানবাধিকার লঙ্ঘনের স্পষ্ট চিহ্ন বহন করছে।
গাজার যুদ্ধ পরিস্থিতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব এবং অবকাঠামোগত ধ্বংসযজ্ঞ মিলিতভাবে মৃতের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি করেছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, যেখানে হাসপাতাল, স্কুল এবং আবাসিক এলাকা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে, সেখানে সাধারণ মানুষের জীবনহানি ও মানসিক চাপ অস্বাভাবিক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে এই গবেষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসঙ্কলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি যুদ্ধের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও নীতিনির্ধারকদের নজরকাড়া আহ্বান জানাচ্ছে। ল্যানসেটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমন গণহত্যা ও সহিংসতার ঘটনা আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক নীতির আলোকে বিচার করা উচিত।
গাজার পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও উদ্বেগ প্রকাশ করছে। আল জাজিরা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, সহিংসতার ফলে স্থানীয় মানুষদের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়েছে। সাপ্লাই চেইন, খাদ্য, পানি এবং চিকিৎসা সেবার ঘাটতি মানুষকে আরো দুর্বল অবস্থায় ফেলেছে। এই পরিস্থিতিতে শিশু ও বৃদ্ধদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ল্যানসেটের গবেষণা ইঙ্গিত দেয়, শুধুমাত্র সরকারি বা রাজনৈতিক তথ্যের ওপর নির্ভর করলে প্রকৃত প্রাণহানির পরিসংখ্যান বোঝা সম্ভব নয়। স্বাধীন ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণ মানুষকে যুদ্ধ ও সহিংসতার প্রকৃত চিত্র দেখাতে সহায়তা করে। প্রতিবেদনে গাজার নাগরিকদের নিরাপত্তা, জীবন ও মৌলিক অধিকার রক্ষার গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ন্যায্য ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। বিশেষ করে মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা গাজার নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং পুনর্বাসন ও জরুরি সহায়তা প্রদানে তৎপর হচ্ছে। গাজার উপত্যকা মানবতার জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যেখানে সহিংসতার ভয়াবহ প্রভাবের প্রতিফলন স্পষ্ট।
গাজার এই ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব বেড়েছে। শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন বৈশ্বিক পদক্ষেপ। ল্যানসেটের গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণিত হল, গাজায় সহিংসতা ও প্রাণহানির সংখ্যা অব্যাহতভাবে বাড়ছে এবং তা আন্তর্জাতিক মনোযোগ দাবি করছে।