প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চায়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত শ্রীমঙ্গল আবারও আলোচনায় এসেছে, তবে এবার চা নয়— লেবুর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিকে ঘিরে। মৌলভীবাজার জেলার এই সমৃদ্ধ কৃষি অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরে দেশজুড়ে মানসম্মত কাগজি, জারা ও চায়না জাতের লেবুর জন্য পরিচিত। স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে এখানকার লেবু নিয়মিত সরবরাহ করা হয় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন পাইকারি বাজারে। কিন্তু চলতি মৌসুমে হঠাৎ করেই লেবুর দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী পর্যন্ত সবাই পড়েছেন বিপাকে।
স্থানীয় বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মাত্র এক মাস আগেও যেখানে প্রতি হালি লেবু বিক্রি হতো ২৫ থেকে ৪০ টাকায়, এখন সেই একই লেবু সাইজভেদে বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত। বড় আকারের লেবুর দাম সর্বোচ্চ ২০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে, মাঝারি আকারের লেবু বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৭৫ টাকায় এবং ছোট আকারের লেবুর দাম ৮০ থেকে ১০০ টাকা। এই দামে ক্রেতারা বিস্মিত ও হতাশ, কারণ এত অল্প সময়ের মধ্যে এত বড় মূল্যবৃদ্ধি তাদের প্রত্যাশার বাইরে।
বৃহস্পতিবার শহরের বিভিন্ন খুচরা বাজার ও পাইকারি আড়ত ঘুরে দেখা যায়, বাজারে লেবুর সরবরাহ তুলনামূলক কম। অনেক বিক্রেতা অল্প পরিমাণ লেবু নিয়ে বসে থাকলেও ক্রেতা কম থাকায় বিক্রি হচ্ছে ধীরগতিতে। বিক্রেতারা বলছেন, চাহিদা থাকলেও উচ্চমূল্যের কারণে ক্রেতারা কিনতে সাহস পাচ্ছেন না। ফলে বাজারে এক ধরনের অস্বাভাবিক স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, যেখানে পণ্য আছে কিন্তু ক্রেতা নেই।
খুচরা বিক্রেতারা জানান, আড়ত থেকে লেবু কিনতেই তাদের প্রতি পিস ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত খরচ পড়ছে। এর সঙ্গে পরিবহন ব্যয়, শ্রমিক মজুরি, দোকান ভাড়া ও অন্যান্য খরচ যুক্ত হলে তাদের বিক্রয়মূল্য বাড়ানো ছাড়া উপায় থাকে না। বিক্রেতা মুসাব্বির মিয়া বলেন, বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ প্রায় এক-চতুর্থাংশে নেমে এসেছে। আড়তে গেলেও পর্যাপ্ত লেবু পাওয়া যাচ্ছে না। বেশি দামে কিনে কম লাভে বিক্রি করতে হচ্ছে, তবু ক্রেতাদের কাছে দাম বেশি মনে হচ্ছে।
আরেক বিক্রেতা রিপন মিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, আগে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ পিস লেবু বিক্রি হলেও এখন তা নেমে এসেছে ১০০ থেকে ১৫০ পিসে। তিনি বলেন, দাম শুনে অনেকেই লেবু না কিনে ফিরে যাচ্ছেন। এতে ব্যবসায়ীদের আয় কমে গেছে এবং বাজারে পণ্যের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে।
ক্রেতাদের দিক থেকেও পরিস্থিতি কম উদ্বেগজনক নয়। সামনে রমজান মাস, আর ইফতারের টেবিলে লেবুর শরবত বা লেবু ছাড়া অনেক খাবার অসম্পূর্ণ মনে হয়। ফলে এই সময় লেবুর চাহিদা সাধারণত বাড়ে। কিন্তু বর্তমান দামে অনেক পরিবার লেবু কিনতে পারছেন না। স্থানীয় বাসিন্দা মাসুম আহমদ বলেন, শ্রীমঙ্গল লেবুর জন্য বিখ্যাত, অথচ এখানকার মানুষই এখন প্রয়োজন অনুযায়ী লেবু কিনতে পারছেন না। তার মতে, দাম নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
লেবু ব্যবসায়ী বারিক মিয়ার বক্তব্যে উঠে এসেছে মূল্যবৃদ্ধির পেছনের কৃষি বাস্তবতা। তিনি জানান, দীর্ঘদিন বৃষ্টিপাত না হওয়ায় পাহাড়ি বাগানগুলোতে পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এর ফলে গাছের ফলন কমে গেছে। স্বাভাবিক মৌসুমে একটি গাছে যেখানে ২৫০ থেকে ৩০০টি লেবু ধরে, সেখানে এখন অনেক গাছে ১০ থেকে ১৫টির বেশি লেবু নেই। ফলে উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ কমেছে এবং স্বাভাবিকভাবেই দাম বেড়েছে।
স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারাও এই পরিস্থিতির সত্যতা স্বীকার করেছেন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আলাউদ্দিন বলেন, পুরো উপজেলায় প্রায় ১ হাজার ২৩৫ হেক্টর জমিতে লেবুর চাষ হয় এবং কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তবে এবারের মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। তিনি জানান, আবহাওয়ার স্বাভাবিকতা ফিরে এলে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে পারে।
মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনও সক্রিয় রয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইসলাম উদ্দিন। তিনি বলেন, প্রশাসনের উদ্যোগে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, পুলিশ এবং উপজেলা ও পৌর প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে বাজার মনিটরিং করা হয়েছে। খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতাদের সতর্ক করা হয়েছে যাতে তারা অযৌক্তিকভাবে দাম না বাড়ান। তিনি আশ্বাস দেন, বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত নজরদারি চালানো হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কৃষিপণ্যের বাজারে সরবরাহ কমে গেলে দাম বাড়া স্বাভাবিক একটি অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া। তবে সমস্যা হয় যখন সরবরাহ সংকটের সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ অতিরিক্ত মুনাফা করার চেষ্টা করে। তাই প্রশাসনিক নজরদারির পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে, যার ফলে ভবিষ্যতে এমন মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা আরও বাড়তে পারে।
বিশ্লেষকরা আরও বলেন, কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থাকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করা গেলে সরবরাহ সংকট অনেকাংশে কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে কৃষকদের জন্য সেচ সুবিধা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু সহনশীল জাত উদ্ভাবন করা গেলে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা সহজ হবে।
বর্তমান পরিস্থিতি একদিকে যেমন ক্রেতাদের জন্য চাপ তৈরি করেছে, অন্যদিকে কৃষকদের জন্যও এটি একটি মিশ্র বাস্তবতা তৈরি করেছে। ফলন কম হওয়ায় অনেক কৃষক প্রত্যাশিত লাভ পাচ্ছেন না, আবার যারা কিছুটা ফলন পেয়েছেন তারা বেশি দামে বিক্রি করে সাময়িক সুবিধা পাচ্ছেন। তবে সামগ্রিকভাবে বাজারের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় সবাই এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
সব মিলিয়ে শ্রীমঙ্গলের লেবুর বাজারে চলমান অস্থিরতা স্থানীয় অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব ফেলছে। আবহাওয়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া, সরবরাহ বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক নজরদারি জোরদার হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ততদিন পর্যন্ত ক্রেতাদের জন্য লেবু যেন বিলাসপণ্যে পরিণত না হয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।