ইরানে হামলা নিয়ে মার্কিন সংকেতের অপেক্ষায় ইসরাইল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৩ বার
ইরানে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় ইসরাইল

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে এমন এক সময়ে, যখন ইসরাইল সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ইরান-এর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার ওপর হামলা চালানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্র-এর রাজনৈতিক অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে তেল আবিব। এই খবর সামনে আসতেই আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে, কারণ এমন পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে পুরো অঞ্চলে বড় ধরনের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তুরস্কভিত্তিক বার্তা সংস্থা আনাদোলু জানিয়েছে, ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম কান-এর এক প্রতিবেদনের বরাতে এই তথ্য পাওয়া গেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরাইলি সামরিক ও গোয়েন্দা মহল সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা প্রস্তুত রেখেছে এবং এখন কেবল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করছে। সূত্রগুলোর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র যদি সবুজ সংকেত দেয়, তাহলে অল্প সময়ের মধ্যেই অভিযান শুরু হতে পারে।

এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে কারণ একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান ইস্যুতে নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছেন বলে জানা গেছে। মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সূত্র উদ্ধৃত করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, ওই বৈঠকে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ, আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া এবং কূটনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। আলোচনায় আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনায় এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইসরাইলি দৈনিক হারেৎজ জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশটির নিরাপত্তা বিশ্লেষণ বিভাগ যে মূল্যায়ন দিয়েছে, তাতে ইঙ্গিত মিলেছে যে ওয়াশিংটন ও তেহরান-এর মধ্যে সর্বশেষ কূটনৈতিক আলোচনার পর উত্তেজনা আরও বেড়েছে এবং সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনাও আগের তুলনায় বেশি। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আলোচনার অগ্রগতি সন্তোষজনক না হলে শক্তি প্রয়োগের পথ বেছে নেওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বরাবরই বহুমাত্রিক এবং জটিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখে আসছে। তাদের দাবি, ইরান যে ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি উন্নয়ন করছে, তা শুধু আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে পারে না, বরং ইসরাইলের নিরাপত্তা অবকাঠামোকেও সরাসরি ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। অন্যদিকে ইরান বরাবরই বলছে, তাদের সামরিক কর্মসূচি প্রতিরক্ষামূলক এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে পরিচালিত হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতির খবর প্রকাশিত হওয়া কেবল সামরিক উত্তেজনার ইঙ্গিত নয়, বরং এটি কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের একটি কৌশলও হতে পারে। অনেক সময় রাষ্ট্রগুলো প্রতিপক্ষকে আলোচনার টেবিলে আনতে বা তাদের অবস্থান পরিবর্তনে বাধ্য করতে এমন সামরিক প্রস্তুতির সংকেত দেয়। ফলে বাস্তবে হামলা না হলেও এমন বার্তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনে ব্যবহৃত হতে পারে।

তবে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। কারণ ইরান মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র এবং তাদের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত মানে কেবল দ্বিপাক্ষিক যুদ্ধ নয়, বরং পুরো অঞ্চলে প্রক্সি সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি। ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলো বিভিন্ন দেশে সক্রিয় থাকায় একটি আক্রমণ বড় আকারের বহুমুখী সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।

এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল সংযম ও আলোচনার ওপর জোর দিচ্ছে। জাতিসংঘের সাবেক কূটনীতিকদের মতে, সামরিক অভিযান শুরু হলে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হওয়ায় এখানে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।

অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানই এই পরিস্থিতির মূল নির্ধারক। কারণ ইসরাইল ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং বড় ধরনের সামরিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের সমর্থন তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যদি যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সমর্থন দেয়, তাহলে ইসরাইলের জন্য সামরিক অভিযান পরিচালনা করা সহজ হবে। আর যদি সমর্থন না দেয়, তাহলে পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও অভিযান স্থগিত থাকতে পারে।

ইরানের অভ্যন্তরেও এই খবর নিয়ে উদ্বেগ ও প্রস্তুতির আলোচনা চলছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। দেশটির সামরিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা মাথায় রেখে প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি জোরদার করা হচ্ছে। যদিও সরকারি পর্যায়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি, তবে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে সতর্ক অবস্থানের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

মানবিক দিক থেকেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। মধ্যপ্রাচ্যে অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, বড় শক্তিগুলোর সামরিক সংঘাতের প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপরই সবচেয়ে বেশি পড়ে। যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দিলেই বিনিয়োগ কমে যায়, পর্যটন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়। ফলে সম্ভাব্য সংঘাতের খবর ছড়িয়ে পড়তেই অনেকেই ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।

বিশ্ব রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কূটনৈতিক সংলাপ অব্যাহত রাখা। সামরিক শক্তির প্রদর্শন যতই বাড়ুক, শেষ পর্যন্ত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে আলোচনার বিকল্প নেই। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, উত্তেজনার চূড়ান্ত মুহূর্তেও কূটনৈতিক সমঝোতা যুদ্ধ ঠেকাতে সক্ষম হয়েছে।

সব মিলিয়ে ইরানকে ঘিরে ইসরাইলের সম্ভাব্য সামরিক প্রস্তুতির খবর আন্তর্জাতিক রাজনীতির অঙ্গনে নতুন উত্তেজনার সঞ্চার করেছে। এখন সবার নজর যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের দিকে, কারণ তাদের অবস্থানই নির্ধারণ করতে পারে মধ্যপ্রাচ্য শান্ত থাকবে নাকি নতুন সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাবে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক দিনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপের ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত