স্বৈরাচার থেকে শিক্ষা না নিলে একই পরিণতি: এনসিপি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৪ বার
স্বৈরাচার থেকে শিক্ষা না নিলে একই পরিণতি: এনসিপি

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবেশ ও গণমাধ্যম পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি। দলটি বলেছে, ইতিহাসের শিক্ষা উপেক্ষা করে ভিন্নমত দমন বা গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের পথে হাঁটলে যেকোনো সরকারকেই শেষ পর্যন্ত একই পরিণতি বরণ করতে হতে পারে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিতে দলটির পক্ষ থেকে এ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে স্বাক্ষর করেন দলের মিডিয়া সেলের সদস্য সাদিয়া ফারজানা দিনা। সেখানে উল্লেখ করা হয়, সম্প্রতি টেলিভিশন সাংবাদিকদের শোকজ নোটিশ দেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব মোর্শেদ-কে ঘিরে বিতর্কিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়া দেশের গণমাধ্যম স্বাধীনতার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয়। দলটির ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনা কেবল বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রবণতার প্রতিফলন হতে পারে।

এনসিপি তাদের বিবৃতিতে দাবি করে, গণভোট ও সংস্কার প্রশ্নে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মত প্রকাশ করায় বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এখন টিভি-এর চার সাংবাদিককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে, যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক নজির হিসেবে দেখা হচ্ছে। দলটি আরও অভিযোগ করে, রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থার প্রধানকে অপসারণের লক্ষ্যে একটি সংগঠিত চাপ বা জনমত তৈরি করার চেষ্টা চলছে, যা গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য শুভ লক্ষণ নয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই যদি গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের ঘিরে এমন বিতর্ক তৈরি হয়, তাহলে তা স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রশ্ন তোলে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার ও গণমাধ্যমের সম্পর্ক হওয়া উচিত পারস্পরিক জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে। তবে কোনো পক্ষ যদি অন্য পক্ষের ওপর অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করতে চায়, তাহলে সেই ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এনসিপি তাদের বক্তব্যে এই আশঙ্কাই তুলে ধরেছে এবং বলেছে, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের যে অভিযোগ উঠছে, তা ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটের পূর্বাভাস হতে পারে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, অতীতে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন সময় এসেছে যখন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করা হয়েছিল এবং বিরোধী মতকে দমন করার চেষ্টা হয়েছিল। এনসিপির ভাষায়, সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি, কারণ ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—দমননীতির পথ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। দলটি মনে করে, গণতন্ত্রের শক্তি বাড়াতে হলে ভিন্নমতকে প্রতিপক্ষ নয়, বরং প্রয়োজনীয় সমালোচনার অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে তারা উল্লেখ করেছে যে নতুন সরকার গঠনের পরদিনই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপের অভিযোগ ওঠা রাজনৈতিক পরিবেশের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে না। দলটির মতে, এতে জনগণের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে ভবিষ্যতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্র সংকুচিত হতে পারে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, যদি সত্যিই কোনো অনিয়ম ঘটে থাকে, তবে তা স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণ করা উচিত, যাতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রতি জনআস্থা বজায় থাকে।

রাজনৈতিক মহলে এ মন্তব্য নিয়ে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, বিরোধী দল হিসেবে এনসিপির এই বক্তব্য স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া, কারণ নতুন সরকার গঠনের পর বিরোধী দলগুলো সাধারণত গণতান্ত্রিক পরিবেশের বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নেয়। আবার অন্য বিশ্লেষকদের মতে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রশ্নে যেকোনো রাজনৈতিক দলের উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত, কারণ এটি কেবল রাজনৈতিক ইস্যু নয়, বরং রাষ্ট্রের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে জড়িত একটি মৌলিক বিষয়।

এনসিপির বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, গণমাধ্যমের মালিকদের ওপর চাপ সৃষ্টি বা উচ্চপর্যায়ে রাজনৈতিক আনুগত্যসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে যদি সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়, তাহলে তা গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে। দলটির মতে, গণমাধ্যম স্বাধীন না থাকলে জনগণ সঠিক তথ্য থেকে বঞ্চিত হয় এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহিতা দুর্বল হয়ে পড়ে।

তারা দাবি করেছে, জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল, সেটি যেন বাস্তবে ক্ষুণ্ন না হয়। এনসিপি মনে করে, সেই আন্দোলনের মূল চেতনা ছিল স্বাধীন মতপ্রকাশ ও অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা। তাই কোনো সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ যদি সেই চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে তা জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে।

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যম স্বাধীনতা ইস্যুটি নতুন নয়। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সরকারই এ প্রশ্নে সমালোচনার মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও গণমাধ্যম পর্যবেক্ষক সংগঠনগুলোও অতীতে বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিবেশ নিয়ে নানা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ফলে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই ইস্যুটি আবার সামনে আসায় স্বাভাবিকভাবেই জনমনে আগ্রহ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও স্বচ্ছ পদক্ষেপ প্রয়োজন। কারণ গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে যদি অনিশ্চয়তা থাকে, তাহলে তা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে তারা বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত দায়িত্বশীল ভাষা ব্যবহার করা, যাতে উত্তেজনা না বাড়ে এবং সংলাপের পরিবেশ বজায় থাকে।

উল্লেখ্য, বর্তমান সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নেতৃত্বাধীন জোট। নতুন প্রশাসনের সামনে অর্থনীতি, প্রশাসনিক সংস্কার ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা—সব মিলিয়ে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এই বাস্তবতায় গণমাধ্যম ইস্যুতে যে কোনো বিতর্ক সরকার ও বিরোধী দল উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। বিশেষ করে ফেসবুক-এ বিভিন্ন মতামত প্রকাশ পাচ্ছে, যেখানে কেউ এনসিপির বক্তব্যকে সমর্থন করছেন, আবার কেউ এটিকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন। তবে সাধারণ পর্যবেক্ষকদের মতে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রশ্নে জনমতের গুরুত্ব সবসময়ই বেশি থাকে এবং সেই কারণেই বিষয়টি দ্রুত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।

সব মিলিয়ে এনসিপির এই সতর্কবার্তা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ইতিহাসের শিক্ষা, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এবং গণমাধ্যম স্বাধীনতার প্রশ্ন—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা আগামী দিনে রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত