পীরগঞ্জ হত্যা মামলার আসামি গাজীপুরে গ্রেপ্তার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৪ বার
র‌্যাবের অভিযানে হত্যা মামলার আসামি গ্রেপ্তার

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ শেষ পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী হত্যাকাণ্ডে গড়ায়, আর সেই ঘটনায় অভিযুক্ত প্রধান আসামিকে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বহুল আলোচিত এই মামলার পলাতক আসামি মো. নুর আমিনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-১৩। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তিগত নজরদারির সমন্বয়ে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা সম্ভব হয়েছে, যা হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

র‌্যাবের কর্মকর্তারা জানান, ঘটনাটি ঘটেছিল রংপুর জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার একটি গ্রামীণ এলাকায়, যেখানে জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধ দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়ভাবে উত্তেজনার কারণ ছিল। গত ৩০ জানুয়ারি সকালে ভুক্তভোগী ব্যক্তি নিজের ভুট্টা ক্ষেত থেকে বাড়ি ফেরার পথে কুমরসই দাখিল মাদ্রাসার পাশের পাকা সড়কে পৌঁছালে অভিযুক্ত ব্যক্তি ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার মাথায় আঘাত করে। গুরুতর আঘাতে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী ঘটনাস্থলেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়।

এই হত্যাকাণ্ডের পর এলাকাজুড়ে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভুক্তভোগীর চিৎকার শুনে আশপাশের মানুষ ছুটে এলে হামলাকারীরা দ্রুত পালিয়ে যায়। ঘটনার পর নিহতের ছেলে বাদী হয়ে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন এবং তখন থেকেই অভিযুক্তরা আত্মগোপনে চলে যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, জমি নিয়ে বিরোধটি নতুন নয়; দীর্ঘদিন ধরে চলা বিরোধের জেরেই শেষ পর্যন্ত সহিংসতার রূপ নেয় পরিস্থিতি।

র‌্যাব-১৩ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বিপ্লব কুমার গোস্বামী জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এটিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে। তিনি বলেন, হত্যার পর থেকেই প্রধান আসামিসহ জড়িতরা পালিয়ে থাকায় তাদের ধরতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয় এবং বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করা হয়। শেষ পর্যন্ত তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাদের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তি আত্মগোপনে থাকতে রাজধানীর আশপাশে অবস্থান পরিবর্তন করছিলেন, যাতে তাকে শনাক্ত করা না যায়। তবে ধারাবাহিক নজরদারি চালিয়ে তার অবস্থান নিশ্চিত করা হলে র‌্যাবের একটি বিশেষ দল অভিযান চালিয়ে গাজীপুর সদরের দক্ষিণ কাউলতিয়া বাউপাড়া এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে। অভিযানের সময় তিনি কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেননি এবং তাকে তাৎক্ষণিকভাবে হেফাজতে নেওয়া হয়।

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, গ্রেপ্তারকৃত আসামির বিরুদ্ধে হত্যা মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে এবং প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন কি না তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। তবে তদন্ত কর্মকর্তারা মনে করছেন, তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে হত্যাকাণ্ডের পেছনের প্রকৃত কারণ ও অন্যান্য জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে গ্রেপ্তারকৃত আসামিকে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন কর্মকর্তারা। থানার পুলিশ জানিয়েছে, তাকে আদালতে হাজির করে রিমান্ড আবেদন করা হতে পারে, যাতে ঘটনার বিস্তারিত তথ্য উদঘাটন করা যায়। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিত ছিল কি না এবং এতে অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

স্থানীয়দের অনেকেই মনে করছেন, জমি নিয়ে বিরোধ গ্রামীণ সমাজে বহু পুরোনো সমস্যা হলেও তা কখনো কখনো মারাত্মক সহিংসতায় রূপ নেয়, যা পরিবার ও সমাজে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। নিহত ব্যক্তির স্বজনরা অভিযোগ করেছেন, বিরোধের বিষয়টি আগে থেকেই প্রশাসনকে জানানো হলেও কার্যকর সমাধান না হওয়ায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

গ্রেপ্তার হওয়া আসামি মো. নুর আমিন স্থানীয়ভাবে পরিচিত ছিলেন এবং তার বাবা আনিসুর রহমান এলাকায় দীর্ঘদিন বসবাস করতেন বলে জানা গেছে। এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত ও নিহত পরিবারের মধ্যে জমি সীমানা নিয়ে বিরোধ দীর্ঘদিনের। স্থানীয়ভাবে কয়েকবার সালিশ বৈঠক হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, গ্রামীণ এলাকায় জমি সংক্রান্ত বিরোধের মামলাগুলো অনেক সময় দ্রুত সহিংসতায় রূপ নেয়, কারণ এসব বিরোধে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সামাজিক মর্যাদা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ একসঙ্গে জড়িত থাকে। ফলে সামান্য উত্তেজনাও বড় সংঘর্ষে পরিণত হতে পারে। তারা বলছেন, এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সমাজপতিদের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িত কেউই আইনের বাইরে থাকতে পারে না এবং পলাতক থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব। এই গ্রেপ্তার তারই প্রমাণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে তারা সাধারণ জনগণকে যেকোনো অপরাধ সংক্রান্ত তথ্য গোপন না রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন।

এদিকে এলাকায় এখনো ঘটনার রেশ কাটেনি। নিহত ব্যক্তির পরিবার ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা করছে এবং দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছে। স্থানীয়রা আশা করছেন, এই গ্রেপ্তার তদন্তকে এগিয়ে নেবে এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অন্য কেউ থাকলে তাদেরও দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।

ঘটনাটি আবারও স্মরণ করিয়ে দিল, ব্যক্তিগত বিরোধ বা সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব যখন আইনি ও সামাজিক কাঠামোর মাধ্যমে সমাধান করা যায় না, তখন তা সমাজে সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ায়। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অপরাধী গ্রেপ্তার নয়, এমন বিরোধের মূল কারণ চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত