প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে সরকার যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা করছে, তার প্রাথমিক ধাপ শুরু হচ্ছে আসন্ন রমজান মাসেই। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু জানিয়েছেন, ঈদের আগেই পরীক্ষামূলকভাবে এই কর্মসূচি চালু করার লক্ষ্যে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে এবং এর বাস্তবায়ন কাঠামো নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় পর্যায়ে আলোচনা ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ে এই উদ্যোগকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা ধাপে ধাপে দেশের সব শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রী বলেন, নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নের পথরেখা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, এই কর্মসূচি কেবল একটি সহায়তা প্রকল্প নয়; বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ভাবা হচ্ছে, যাতে দেশের প্রতিটি পরিবার ধীরে ধীরে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
মন্ত্রী জানান, পরিকল্পনা অনুযায়ী কর্মসূচিটি সার্বজনীন কাঠামোর ওপর দাঁড়াবে। অর্থাৎ শুরুতে নির্দিষ্ট শ্রেণিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও চূড়ান্ত লক্ষ্য থাকবে সব পরিবারকে এর আওতায় আনা। তিনি বলেন, প্রথম ধাপে হতদরিদ্র পরিবারগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর ধাপে ধাপে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবার এবং পরে মধ্যবিত্তদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এভাবে পর্যায়ক্রমে পুরো সমাজকে একটি একীভূত সুবিধা ব্যবস্থার আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
সরকারি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ডের ধারণাটি মূলত এমন একটি ডিজিটাল বা পরিচয়ভিত্তিক ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে পরিবারভিত্তিক সরকারি সুবিধা বণ্টন সহজ হবে। এতে খাদ্য সহায়তা, ভর্তুকি, স্বাস্থ্যসেবা বা অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সমন্বিতভাবে দেওয়া সম্ভব হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেসভিত্তিক ব্যবস্থা চালু হলে সহায়তা বণ্টনে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং একই পরিবার একাধিক সুবিধা নিচ্ছে কি না তা যাচাই করা সহজ হবে।
মন্ত্রী আরও জানান, প্রধানমন্ত্রী চান অন্তত পাইলট প্রকল্প হিসেবে ঈদের আগেই এই কর্মসূচি চালু হোক, যাতে বাস্তবায়নের সময় যে ধরনের প্রশাসনিক বা প্রযুক্তিগত জটিলতা দেখা দিতে পারে, তা দ্রুত চিহ্নিত করে সমাধান করা যায়। তিনি বলেন, একটি নতুন জাতীয় পর্যায়ের প্রকল্প চালুর ক্ষেত্রে প্রথমে সীমিত পরিসরে পরীক্ষা করা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি পদ্ধতি। এতে প্রকল্পের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা সহজ হয় এবং পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের আগে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা যায়।
নীতিনির্ধারক মহলে ধারণা করা হচ্ছে, এই কর্মসূচি চালু হলে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বিভিন্ন ভাতা ও সহায়তা কার্যক্রমকে একীভূত করা সম্ভব হবে। বর্তমানে দেশে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের অধীনে বহু ধরনের ভাতা ও সহায়তা কর্মসূচি পরিচালিত হয়, যার ফলে অনেক সময় একই পরিবার একাধিক সুবিধা পেলেও অন্য পরিবার কোনো সুবিধাই পায় না। ফ্যামিলি কার্ড ব্যবস্থা চালু হলে একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারের মাধ্যমে এই বৈষম্য কমানো সম্ভব হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনেও এই ঘোষণাকে ঘিরে আলোচনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) সম্প্রতি মন্তব্য করেছে, আগামী অর্থবছরের মধ্যে যদি এই কর্মসূচি চালু না হয়, তাহলে তার নেতিবাচক প্রভাব নির্বাচনী পরিবেশে পড়তে পারে। এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, প্রকল্পটি চালু হওয়া নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা নেই। তিনি আশ্বাস দেন, সরকার কেবল বাস্তবায়নের কার্যকর পদ্ধতি নির্ধারণ করছে এবং সেটি চূড়ান্ত হলেই কাজ শুরু হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের সফলতা অনেকটাই নির্ভর করবে তথ্যভান্ডারের নির্ভুলতা, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর ওপর। যদি সঠিকভাবে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করা যায়, তাহলে এটি দেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক ও কার্যকর করে তুলতে পারে। তবে তথ্যভান্ডারে ভুল বা অনিয়ম থাকলে প্রকল্পটি কাঙ্ক্ষিত ফল নাও দিতে পারে। তাই শুরু থেকেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি বলে তারা মনে করেন।
সামাজিক উন্নয়ন বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, এই ধরনের পরিবারভিত্তিক কার্ড ব্যবস্থা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচির একটি কার্যকর উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে সরকারি সহায়তা সরাসরি প্রাপকের কাছে পৌঁছানো সহজ হয় এবং মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ কমে যায়। বাংলাদেশে যদি এটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক বৈষম্য কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো প্রকল্পটির বাস্তব রূপ নিয়ে কৌতূহল রয়েছে। কার্ডটি কীভাবে বিতরণ করা হবে, কোন তথ্যের ভিত্তিতে পরিবার নির্বাচন করা হবে, এবং কী ধরনের সুবিধা এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো দেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পাইলট প্রকল্প চালুর আগে এসব বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশিকা প্রকাশ করা হবে।
সরকারি নীতিনির্ধারকদের মতে, রমজান মাসে পাইলট কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনার পেছনে একটি মানবিক দিকও রয়েছে। রমজান এমন একটি সময়, যখন নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর ওপর আর্থিক চাপ কিছুটা বেড়ে যায়। তাই এই সময়ে সহায়তামূলক কর্মসূচি চালু করা হলে তা সরাসরি মানুষের উপকারে আসবে এবং প্রকল্পটির কার্যকারিতা বাস্তব পরিস্থিতিতে যাচাই করা সম্ভব হবে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, যদি পাইলট প্রকল্প সফল হয়, তাহলে আগামী অর্থবছর থেকেই এটি ধাপে ধাপে দেশব্যাপী বিস্তৃত হতে পারে। তবে সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনিক সমন্বয়, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা এবং তথ্যের গোপনীয়তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি এখন সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। রমজান মাসে এর পাইলট চালুর ঘোষণায় সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে। এখন দেখার বিষয়, পরীক্ষামূলক বাস্তবায়নে কী ফল আসে এবং সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সরকার কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে এটি জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণ করতে পারে।