জনআস্থা অর্জনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দ্রুত প্রত্যাশা পূরণের নির্দেশ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫ বার
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নবনিযুক্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে দ্রুত জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, দীর্ঘ সময় পর একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত রাজনৈতিক সরকারের প্রতি জনগণের আশা অনেক বেশি, তাই সেই প্রত্যাশা পূরণে বাহিনীগুলোকে আস্থা অর্জনের মাধ্যমে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সভায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর আওতাধীন বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বর্তমান অবস্থা, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাব্য সংস্কার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

মন্ত্রী বলেন, প্রায় দেড় যুগ পর জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে একটি স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা শুধু প্রশাসনিক দক্ষতা নয়, বরং সুশাসন, জবাবদিহি ও মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা। তিনি উল্লেখ করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। কারণ জনগণ যখন নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা রাখে, তখনই রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়।

তিনি আরও বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারে যে গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য বাহিনীগুলোর কাঠামো, নীতিমালা ও কার্যপদ্ধতি আধুনিকায়ন করতে হবে এবং জনগণের চাহিদা অনুযায়ী অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। মন্ত্রী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন, মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সংস্কারের সুস্পষ্ট প্রস্তাব তৈরি করতে, যাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ দ্রুত ও কার্যকর হয়।

সভায় উপস্থিত কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কেবল অপরাধ দমনকারী শক্তি হিসেবে নয়, বরং নাগরিকবান্ধব সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তিনি জানান, মানুষের অভিযোগ দ্রুত শোনা, তদন্তে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং মানবাধিকার সম্মান করার মাধ্যমে বাহিনীগুলো নিজেদের ভাবমূর্তি ইতিবাচকভাবে পরিবর্তন করতে পারে।

সভায় উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (রুটিন দায়িত্ব) মো. দেলোয়ার হোসেন, মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম এবং বিভিন্ন সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তাঁরা মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য চলমান কার্যক্রম, জনবল সংকট, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার বিষয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। কর্মকর্তাদের বক্তব্য শোনার পর মন্ত্রী বলেন, বাস্তব সমস্যাগুলো সমাধানে প্রয়োজন হলে নতুন নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এবং অর্থ বরাদ্দের বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত নিষ্পত্তি করা হবে।

মন্ত্রী জানান, বাহিনীগুলোর পুনর্গঠন ও নৈতিকতা উন্নয়নের মাধ্যমে জনআস্থা অর্জনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষায়, বাহিনীর সদস্যদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নৈতিক মানদণ্ড শক্তিশালী করা জরুরি। এজন্য প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় আধুনিক পাঠ্যক্রম যুক্ত করা, প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত পদ্ধতি চালু করা এবং অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি ব্যবস্থা জোরদার করার প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে।

তিনি বলেন, নতুন জনবল নিয়োগ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বর্তমান বাস্তবতায় জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ বৃদ্ধির কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর চাপ বেড়েছে। তাই পর্যাপ্ত সংখ্যক দক্ষ জনবল ছাড়া কাঙ্ক্ষিত মানের সেবা দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে দ্রুত জনবল চাহিদার তালিকা তৈরি করে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন, যাতে প্রয়োজনীয় অনুমোদন দ্রুত নেওয়া যায়।

সভায় আলোচনায় উঠে আসে যে, প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ যেমন সাইবার জালিয়াতি, অনলাইন প্রতারণা ও তথ্য চুরি মোকাবিলায় বাহিনীগুলোকে বিশেষায়িত ইউনিট গড়ে তুলতে হবে। মন্ত্রী এ বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে বলেন, আধুনিক অপরাধ দমনে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অপরিহার্য এবং এজন্য আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম নিশ্চিত করা হবে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে জনমনে যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে, সে বিষয়েও সভায় আলোচনা হয়। মন্ত্রী বলেন, অপরাধের ঘটনা শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব না হলেও দ্রুত প্রতিকার ও কার্যকর তদন্ত নিশ্চিত করা গেলে মানুষের আস্থা বাড়ে। তাই প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া, তদন্তের অগ্রগতি জনগণকে জানানো এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা—এই তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। বিভিন্ন সংস্থা আলাদাভাবে কাজ করলে অনেক সময় তথ্যের সমন্বয় হয় না, ফলে অপরাধ দমন কার্যক্রমে বিলম্ব ঘটে। তাই তথ্য আদান-প্রদানের জন্য সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে একটি সংস্থার তথ্য অন্য সংস্থা দ্রুত ব্যবহার করতে পারে।

সভায় অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা বলেন, মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও প্রযুক্তির অভাব বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। তাঁরা আধুনিক যানবাহন, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং তথ্যপ্রযুক্তি সরঞ্জাম বাড়ানোর সুপারিশ করেন। মন্ত্রী এ বিষয়ে আশ্বাস দিয়ে বলেন, বাস্তব প্রয়োজন বিবেচনা করে ধাপে ধাপে এসব ঘাটতি পূরণ করা হবে।

জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানবিক আচরণ বজায় রাখার ওপরও তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের আচরণই জনগণের কাছে সরকারের ভাবমূর্তি তুলে ধরে। তাই পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি সহানুভূতিশীল মনোভাব গড়ে তোলার জন্য প্রশিক্ষণে মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার কথা ভাবা হচ্ছে।

সভার শেষ পর্যায়ে মন্ত্রী সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও সংস্থার প্রধানদের একটি সুসংগঠিত কর্মপরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, এই পরিকল্পনার ভিত্তিতেই সংস্কারের অগ্রাধিকার ঠিক করা হবে এবং নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে বাস্তবায়ন তদারকি করা হবে। তাঁর প্রত্যাশা, সমন্বিত প্রচেষ্টা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী খুব দ্রুত জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারবে এবং দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারের প্রথম দিকের এই নির্দেশনা ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক দিকনির্দেশনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। কারণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল না থাকলে উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয় এবং বিনিয়োগ পরিবেশেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্র পরিচালনায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সব মিলিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই নির্দেশনাকে প্রশাসনিক মহলে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন নজর থাকবে ঘোষিত পরিকল্পনাগুলো কত দ্রুত বাস্তবে রূপ পায় এবং জনগণ তার সুফল কতটা অনুভব করতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত